বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৩ অপরাহ্ন

বিদায় নিলেন মেসি

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট সময় : 5:38 pm, বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক

মনুমেন্তালের গ্যালারিজুড়ে একটাই নাম মেসি। শেষবার জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নামা মহাতারকাকে বিদায় জানাতে আর্জেন্টিনার মানুষ যেন ভুলে গিয়েছিল সব বিভেদ। কেউ গলা ছেড়ে চিৎকার করেছেন, কেউ চোখের পানি মুছেছেন। স্বয়ং মেসিও পারেননি নিজের আবেগ ধরে রাখতে। বিদায়ী ম্যাচে গোল, অ্যাসিস্ট সবই করেছেন নিজের মতো করে।

আর্জেন্টিনার ফুটবলে একটি অধ্যায়ের শেষ হলো। জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামলেন লিওনেল মেসি। ২১ বছরেরও বেশি সময় ধরে যে জার্সিকে নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিয়েছিলেন, সেটি গায়ে চাপিয়ে শেষবারের মতো মনুমেন্তালের সবুজ ঘাসে পা রাখলেন ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা।

স্টেডিয়ামে তখন হাজারো মানুষের ঢল। মেসি মাঠে আসতেই একসঙ্গে গর্জে উঠল পুরো গ্যালারি- ‘মেসি, মেসি, মেসি’। সেটি কোনো সাধারণ স্লোগান ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, প্রিয় মানুষটিকে বিদায় জানানোর শেষ প্রার্থনা।

মাঠে নামার আগেই আবেগে ভেঙে পড়েছিলেন মেসি। বাসে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে যেন ফিরে যাচ্ছিলেন নিজের শৈশব আর জাতীয় দলের হয়ে কাটানো দীর্ঘ সময়ের স্মৃতিতে। একের পর এক দৃশ্য ভেসে উঠছিল চোখের সামনে। বারবার চোখের পানি মুছছিলেন তিনি।

মনুমেন্তালে পৌঁছানোর পর আবেগ আরও বেড়ে যায়। ড্রেসিংরুম থেকে মাঠে আসার পথেও ছিল বিদায়ের নানা আয়োজন। স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরো গ্যালারিতে আছেন কি না, সেটিও আগে নিশ্চিত করেছিলেন মেসি।

ওয়ার্মআপের সময় গ্যালারি যখন সম্মান জানাতে দাঁড়িয়ে যায়, তখন আর নিজেকে সামলাতে পারেননি তিনি। চারদিকে তাকিয়ে হাত তুলেছেন। যেন প্রত্যেক দর্শককে আলাদা করে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন লিও।

বাবা হোর্হের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে মেসি বলেন, এই মুহূর্তে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা তার জন্য খুব কঠিন। অনেক আবেগ একসঙ্গে মনে ভিড় করছে এবং সবার আগে তার বাবার কথাই মনে পড়ছে।

জাতীয় সংগীতের সময়ও ছিল অন্যরকম দৃশ্য। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেসি, কিন্তু গলা দিয়ে গান বের হচ্ছিল না। আবেগ আটকে দিয়েছিল কণ্ঠ। সেই মুহূর্তে হয়তো মনে পড়ে গিয়েছিল ছোটবেলার রোজারিও। দাদি সেলিয়া অলিভেইরা যে ছোট্ট লিওকে হাত ধরে মাঠে নিয়ে যেতেন, সেই স্মৃতিও হয়তো ফিরে এসেছিল। ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসার শিকড় যে কত গভীরে, মেসির পুরো ক্যারিয়ারই তার প্রমাণ।

বিদায়ী ম্যাচে প্রতিপক্ষ ছিল বেনিন। ম্যাচ শুরুর আগেও দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিল সৌহার্দ্যের আবহ। মেসির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বেনিনের খেলোয়াড়েরাও এগিয়ে আসেন। কিন্তু ম্যাচ শুরু হওয়ার পর মেসি আবারও হয়ে উঠলেন সেই চেনা প্রতিযোগী।

প্রথমার্ধে অবশ্য তাঁকে খুব বেশি ছন্দে দেখা যায়নি। তবে বিরতির পর যেন বদলে গেল দৃশ্যপট। দ্বিতীয়ার্ধে নিকোলাস ওতামেন্দির গোলের পেছনে ছিল মেসির অবদান। তাঁর তৈরি করে দেওয়া সুযোগ থেকেই আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায়।

এরপরও থামেননি তিনি। নিকো পাজের গোলেও ছিল মেসির জাদুকরী ছোঁয়া। আর শেষ পর্যন্ত বিদায়ের মুহূর্তটিকে নিজের করে নিলেন নিজেই। পেনাল্টি থেকে গোল করে পূর্ণ করলেন আর্জেন্টিনার ৩-০ ব্যবধানের জয়।

গোলের পর সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। মেসিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় আনন্দের বৃত্ত। মুখে হাসি, চোখে আবেগ- জাতীয় দলের জার্সিতে যেন এমনই একটি শেষ মুহূর্ত চেয়েছিলেন তিনি।

এই গোলের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়ালো ১২৬। সংখ্যাটি তাঁর অসংখ্য কীর্তির একটি মাত্র অংশ। তাঁর গল্প আসলে গোল কিংবা রেকর্ডের চেয়েও অনেক বড়।

কারণ এই গল্পে আছে ছোট্ট এক ছেলের স্বপ্ন। রোজারিওর সেই ছোট ছেলেটি স্বপ্ন দেখেছিল নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে খেলার। জাতীয় দলের জার্সি পরার। কিন্তু খুব অল্প বয়সেই তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায় গ্রোথ হরমোনের সমস্যা। চিকিৎসার ব্যয়, শৈশবের শহর ছেড়ে অচেনা দেশে পাড়ি- সবকিছুই ছিল কঠিন।

বার্সেলোনায় যাওয়ার পরও জাতীয় দলের স্বপ্ন ছাড়েননি তিনি। স্পেনের হয়ে খেলার সুযোগ পেয়েও আর্জেন্টিনাকে বেছে নিয়েছেন। কারণ তাঁর কাছে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সির মূল্য ছিল অন্যরকম।

অবশ্য এই পথ কখনোই সহজ ছিল না। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পর একসময় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। তখন মেসিকে ঘিরে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। মনে হয়েছিল, হয়তো সত্যিই শেষ হয়ে গেল গল্প।

কিন্তু মেসির গল্প তখনো শেষ হয়নি। ফিরে এসে একে একে পূরণ করেছেন অপূর্ণ স্বপ্ন। জিতেছেন কোপা আমেরিকা। এরপর ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ। যে ট্রফির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত উঠেছে তাঁর হাতে।

বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসির গল্প যেন পূর্ণতা পেয়েছিল। কিন্তু তিনি থামেননি। ৩৯ বছর বয়সেও জাতীয় দলের হয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে গেছেন। তরুণদের সঙ্গে খেলেছেন, তাদের অনুপ্রেরণা হয়েছেন, আবার প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজেই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন।

মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো শুধু ট্রফি নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে একই নিষ্ঠা ধরে রাখা। দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের জার্সিতে খেলেছেন। সমালোচনা সহ্য করেছেন, ব্যর্থতা দেখেছেন, কেঁদেছেন, আবার ফিরে এসেছেন।

একসময় যে ছোট্ট ছেলেটিকে নিয়ে বলা হতো, ‘ও খুব ছোট’, সেই ছেলেটিই আজ একটি দেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নামগুলোর একটি।তাঁর বিদায়ে তাই শুধু একটি ম্যাচ শেষ হয়নি। শেষ হয়েছে একটি যুগ।

আগামী দিনে আর্জেন্টিনার জার্সিতে নতুন মুখ আসবে। নতুন তারকারা আলো ছড়াবেন। নতুন প্রজন্ম বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখবে। কিন্তু গ্যালারিতে যখনই ‘মেসি’ নামটি উচ্চারিত হবে, তখনই ফিরে আসবে একটি পুরো প্রজন্মের স্মৃতি। ফিরে আসবে রোজারিওর ছোট্ট লিও। ফিরে আসবে বার্সেলোনার সেই ক্ষুদে প্রতিভা। ফিরে আসবে বিশ্বকাপের রাত, কোপা আমেরিকার উল্লাস, অগণিত গোল আর অবিশ্বাস্য সব ড্রিবল।

মেসি বিদায় নিলেন। বিদায় নিলেন জাতীয় দল থেকে। কিন্তু ফুটবল থেকে নয়। কারণ কিংবদন্তিরা মাঠ ছাড়েন, ইতিহাস থেকে কখনও বিদায় নেন না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই রকম আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2017 Cninews24.Com
Design & Development BY Hostitbd.Com