
নিজস্ব প্রতিবেদক :
সেদিন ২৪ এপ্রিল। রানাপ্লাজা ট্রাজেডি দিবস। এই দিনেই নিজের শরীরে কেরোসিন দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে আত্মহত্যা করেছেন রানা প্লাজার উদ্ধার কর্মী হিরো নামে খ্যাত নওশাদ হাসান হিমু (২৭)। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করে। বুধবার (২৪ এপ্রিল) রাত ৯টার দিকে সাভারের বিরুলিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হিমু বরিশালের নাজিরপুর এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে ও সাভারের বিরুলিয়া এলাকায় আবুল হকের বাড়ির ভাড়াটিয়া।
স্থানীয়রা জানায়, হিমু রানা প্লাজার উদ্ধার কর্মী ছিলেন। এছাড়াও হিমু মাঝে মধ্যেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলতেন। বুধবার রাত ৯টার দিকে বাড়ির পাশে নিজের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে সে। এ সময় স্থানীয়রা আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করে।
আরো জানা গেছে, রানাপ্লাজা ধ্বসের পর নওশাদ হাসান হিমু ওরফে হিমু হিমালয় নিজের হাতে অনেকের হাত-পা কেটে আহত ও নিহত শ্রমিকদের উদ্ধার করেছিলেন। প্রায় পনের দিন পর্যন্ত দিনরাত ছিলেন সেখানেই। আটকে পড়া শ্রমিকদের করাত দিয়ে হাত-পা কেটে উদ্ধার করেছেন।
পরবর্তীতে আরও টানা ১৭ দিন কাটিয়েছেন হাসপাতালে। নিজের উদ্যোগেই করেছেন পঙ্গু রোগীদের সেবা। এরপর থেকেই চোখের সামনে ভয়াবহ সেসব স্মৃতি মানসপটে ভেসে আসতো তার। রক্ত বা কাঁচা মাংস দেখতে পারতেন না হিমু।
রানাপ্লাজার সেইসব দুঃসহ স্মৃতি প্রতিদিন তাড়া করে বেড়াতো তাকে। মাঝে মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণও করতেন। নিজের জীবনহতাশ করে তুলেছিল তাকে। তাই গত ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজার দুর্ঘটনার ষষ্ঠ বার্ষিকীতে নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি।
নিহতের মা আফরোজা বেগম বলেন , ২০১৩ সালে তারা ঢাকার শ্যামলী এলাকায় থাকতেন। রানাপ্লাজা ভবন ধ্বসের খবর পেয়ে আহত শ্রমিকদের রক্ত দেওয়ার জন্য হিমু তার মাকে সঙ্গে নিয়ে সাভারের রানাপ্লাজায় যায়। তবে ভেতরে অনেক শ্রমিককে আটকে পড়তে দেখে অন্যদের সঙ্গে শুরু করে দেয় উদ্ধার কাজ। ভবন ধসের উদ্ধার কাজ সমাপ্ত হওয়ার দিন পর্যন্ত সে রানা প্লাজায় কাজ করেছে। এরপর সাভারের গণ্যস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রানাপ্লাজার আহত শ্রমিকদের সেবা করে সময় কাটাতো।
রানাপ্লাজার হতাহত শ্রমিকদের পরিবারের সঙ্গেও তার গড়ে উঠে সখ্যতা। অনেকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতো হিমু।
হিমুর বড় বোন নওশিন আফরোজ হিয়া বলেন, ‘সে ছোটবেলা থেকে মানুষের বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতো। এসব করতে করতেই সে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। আমি তাকে একাধিকবার কাউন্সেলিং করার জন্য চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবার কথা বলেছি। কিন্তু ও যেতে চায়নি। আমাদের আসলে জোর করে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। ডিপ্রেশন তাকে শেষ করে দিল।’
হিমুর আত্মাহুতির খবরে মর্গে ছুটে আসা গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘ওর সঙ্গে আমাদের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে পরিচয় হয়। পরবর্তীতে রানাপ্লাজার ঘটনায় ছাত্র ফেডারেশনের ছেলেদের সঙ্গে একসঙ্গে উদ্ধার কাজে অংশ নেয় সে। এরপর থেকেই চোখের সামনে ভয়াবহ সেসব স্মৃতি মানুষ পটে ভেসে আসতো তার মনে । মানবসেবায় আত্মত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সে, তা সবার জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।