শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
টি-টোয়েন্টিতে গেইলের বিশ্ব রেকর্ড ভাঙলেন প্রিটোরিয়াস কিয়েভে গুরুত্বপূর্ণ সেতুতে রাশিয়ার হামলা জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী ভোটে নির্বাচিত সরকারকেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে : এলজিআরডি মন্ত্রী অনলাইনে বিবাহ নিবন্ধনে অনিয়ম, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ কমবে : আইনমন্ত্রী কাজিপুরে আইটি টেকনিশিয়ানের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার  পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘিরে রমরমা বাণিজ্য! কাজীপুরে যমুনার চরে দোল খাচ্ছে শুভ্র কাশবনের ঢেউ স্কুল ঘেঁষে ময়লার ভাগাড়ঃ দুর্গন্ধ-মশার উপদ্রবে ছয় মাস বন্ধ ভবনে পাঠদান কাজীপুরে কাঁচা রাস্তায় হাজারো মানুষের ভোগান্তি 

দখল-দূষণে ধুঁকছে খুলনার ৫৭২ খাল

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় : 5:25 pm, শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬

দখল আর দূষণে স্বাভাবিক পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হওয়ায় ধুঁকছে খুলনার সরকারি তালিকাভুক্ত ৫৭২টি প্রবহমান খাল। এতে যেমন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি পানি সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক ও কৃষি।

স্থানীয় কৃষক, কৃষি দপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দখলদার উচ্ছেদ, নদী ও খালের শ্রেণি পরিবর্তন বন্ধ, বৈজ্ঞানিকভাবে ড্রেজিং, পুরনো পোল্ডার প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন, প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পানি ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত পানি ও পলির মান পরীক্ষা জরুরি। অন্যথায় কৃষি ও প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

এমন অবস্থায় আগামী শুকনো মৌসুমে খননের জন্য সম্ভাব্য ১৬টি খাল তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ জন্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াও শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে খুলনা অঞ্চলের কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত ও ফসলি জমির বর্তমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) বিশেষ জরিপ চালায়। ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলায় প্রবহমান ও সরকারি তালিকাভুক্ত খালের সংখ্যা ৫৭২টি। এসব খালের মধ্যে ৪৪টি খাল লিজে থাকায় কৃষিজমিতে সেচ বিঘ্নিত হয়। সব মিলিয়ে জেলার ৫২২টি খাল ভরাট হয়ে গেছে যার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় দুই হাজার ২০০ কিলোমিটার।

খুলনা কৃষি অঞ্চলের তখনকার অতিরিক্ত পরিচালক মোহন কুমার ঘোষের নেতৃত্বে একটি দল বিশেষ জরিপ ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে তালিকাটি প্রস্তুত করেন। এই তালিকায় ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, পাইকগাছা, তেরখাদা ও রূপসার বিভিন্ন খালের মধ্যে গুয়াগাছিয়া, চুকনগর, শৈলমারি শাখা, হরিণটানা, বাতি-বুটিয়ার, মোজাহারি, চাঁদখালী, নয়াই, গদাইপুর, শিবসা-সংযুক্ত শাখা, ভূঁইয়ার, আঠারোবেকী ও নন্দনপুরের খাল রয়েছে।

এছাড়া কয়রায় ২০ একরের নিচে ৯৯টি জলমহাল রয়েছে, যার চারটি খাল সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। ১৭টির নাব্যতা না থাকায় ইজারা না দিয়ে খাস আদায় করা হচ্ছে। মামলার কারণে ১২টির ইজারা বন্ধ ও তিনটি খালের ইজারা স্থগিত রয়েছে।

স্থানীয় কৃষক, কৃষি দপ্তর ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় খুলনায় ছোট-বড় অসংখ্য খাল জালের মতো ছড়িয়ে ছিল। এসব জলপথ নদ-নদীর সঙ্গে যুক্ত থেকে কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ ও পানি নিষ্কাশনে ভূমিকা রাখতো। কিন্তু পলি জমা, দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা ও মানবসৃষ্ট নানা কারণে অনেক খাল সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

কোনো কোনো খাল পুরোপুরি ভরাট হয়ে গেছে। জেলার ডুমুরিয়ায় নদী-খাল ভরাট ও পানি ওঠানামার পথ বন্ধ হওয়ায় কয়েক দশক ধরে বিল ডাকাতিয়ায় তীব্র জলাদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে, আগামী শুকনো মৌসুমে খুলনার ১৬টি খাল খননের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছে ত্রাণ পুনর্বাসন অধিদপ্তর।
এসব খালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ফুলতলা উপজেলার সায়েলের খাল ও দফাদার খাল; দাকোপ উপজেলার আনন্দনগর খাল; রূপসা উপজেলার শিয়ালী আঠারোবেকী নদী থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত খাল; বটিয়াঘাটা উপজেলার কাটিয়ানাংলা; কয়রা উপজেলার বামিয়া মাথাভাঙা ও আগরগারিয়া; দিঘলিয়া উপজেলার মাথাভাঙা এবং ডুমুরিয়া উপজেলার রূপরামপুর মাড়ুয়া-আমভিটা পর্যন্ত খাল ও ক্ষুদে খাল।

ডুমুরিয়ার কৃষক সমীর কুমার ও উপজেলার খর্ণিয়া গ্রামের বাসিন্দা আবু হানিফ মোড়লের ভাষ্য, ‘প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে কৃষিকাজ করতে হয়। নদী-খালগুলো নষ্ট হওয়ায় শুকনো মৌসুমে তীব্র পানি সংকট শুরু হয়। এজন্য গভীর নলকূপ থেকে পানি সরবরাহ করা হয়। অথচ খাস খালগুলো পুনঃখনন করা হলে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়। এতে কৃষিকাজে কৃষকের খরচ কমে।’

পাইকগাছার বাকা গ্রামের আহাদ আলী গোলদার (৫৯) বলেন, এক সময় খাল দিয়ে বিলের পানি নদীতে নামতো। এখন নদী খনন করা হলেও খালের মুখ বন্ধ। আমাদের বিপদের শেষ নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের বৃষ্টির সময় ডুবতে হয়। খালগুলো খোলা থাকলে আমরা ধান-পান কইরে বাঁচতে পারতাম। পানি নোনা কম হতো।’

এদিকে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, উজানের মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া ও পোল্ডার ব্যবস্থাপনা (চারদিকে বাঁধ দিয়ে নিচু জমি সংরক্ষণ)’র নানা সমস্যায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা ক্রমেই উত্তরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। লবণাক্ততা বাড়ছে মাটিতেও।

২০২৩ সালে ডুমুরিয়ার গুটুদিয়ায় ৪ দশমিক ৬, ফুলতলা-বটিয়াঘাটায় ৪ দশমিক ১, পাইকগাছার শিববাড়ীতে ১৪ ডিএস/মি পর্যন্ত লবণাক্ততার তথ্য রয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পানি সংকটে খরিপ ও রবি মৌসুমে ধান, পাট ও সবজির উৎপাদন ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার কারণে দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছার অনেক এলাকায় সবজি চাষও ব্যাহত হচ্ছে।

অপরদিকে, মৎস্য খাতে চিংড়ি, পাবদা, গজাল ও বোয়ালি বা বেলে জাতীয় মাছের প্রাপ্যতা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

খুলনার নদী ব্যবস্থার বিপর্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল চ্যালেঞ্জেস জি-তে প্রকাশিত এক গবেষণায়। অবশ্য খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশ-বিদেশের পরিবেশ-ভুগোল বিশেষজ্ঞ দল জেলার মধ্যে কেবল ডুমুরিয়ার উপজেলায় এ গবেষণা করে।

গবেষণায় ১৯৮৭-২০২৪ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইট চিত্র, জলবিদ্যাগত তথ্য ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, এ সময় উপজেলার মোট নদী নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ৪৯২ দশমিক ৯ কিলোমিটার থেকে কমে ২০৩ দশমিক ৭ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ৩৭ বছরে নদীর মোট দৈর্ঘ্য কমেছে প্রায় ৫৯ শতাংশ। গড়ে প্রতিবছর হারিয়েছে ৬ দশমিক ১৪ কিলোমিটার নদীপথ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার উপপরিচালক দপ্তরের কৃষি প্রকৌশলী দীপঙ্কর চন্দ্র বালা বলেন, নদী-খালের প্রবাহ বন্ধ হওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি কৃষিতে। বিশেষ করে খুলনাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চল হওয়ায় ভূ-গর্ভস্থ পানি তোলায় বড় বিপর্যয় নেমে আসছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে লবণাক্ততা। তাই নদী-খালগুলোর অবাধ পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারিভাবে এনিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। তবে এ জন্য সমন্বয় প্রয়োজন।

কৃষি প্রকৌশলী দীপঙ্কর বালা জানান, কৃষি বিভাগ এনিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছে। বিগত সময়ে ৬০টির মতো খাল খনন করা হয়েছে। তালিকা প্রস্তুত করে নতুন করে খননের উদ্যোগ রয়েছে। তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

খুলনা জেলা ত্রাণ পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল করিম বলেন, নদী-খাল খনন নিয়ে একাধিক সংস্থা কাজ করে থাকে। ইতোমধ্যে খুলনায় ১৭টি খালের সম্ভাব্য তালিকা হয়েছে। তবে এরমধ্যে একটি খালের নাম দুইবার আসায় খালের সংখ্যা ১৬টি।

এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার লাভ-ক্ষতি দেখে খালখনন প্রকল্প অনুমোদন পাবে। দ্রুত পলি পড়বে এমন খাল অনুমোদন পাবে না। খালগুলো খনন করা হলে কৃষি, মৎস্য এবং পরিবেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়বে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই রকম আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2017 Cninews24.Com
Design & Development BY Hostitbd.Com