
প্রতিবছর বর্ষার মরশুম আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এক আতঙ্কজনক রূপ নেয়। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর ভিড়, আইসিইউ-এর জন্য হাহাকার এবং অকাল মৃত্যুর খবর এখন যেন এক নিয়মিত বর্ষাকালীন চিত্র। এডিস মশাবাহিত এই রোগটি কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, বরং এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিচ্ছন্নতার দুর্বলতাকেও ফুটিয়ে তোলে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ ও ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে পারলে ডেঙ্গু পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি হলো এর বাহক—এডিস মশার বংশবৃদ্ধি রোধ করা। এডিস মশা সাধারণত ঘরবাড়ি বা আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। তাই আপনার বাসা, ছাদ, বারান্দা কিংবা আঙিনায় যাতে কোনোভাবেই তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবহৃত ফুলদানি, টব, এয়ার কন্ডিশনার ও ফ্রিজের ট্রে, অব্যবহৃত টায়ার, ডাবের খোসা ও প্লাস্টিকের পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি। ‘প্রতি সপ্তাহে একদিন, ১০ মিনিট করে নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার করি’—এই অভ্যাসের বাস্তবায়ন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জাদুর মতো কাজ করতে পারে।
একই সাথে ব্যক্তিগত সুরক্ষার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। দিনের বেলাতেও এডিস মশা কামড়াতে পারে, তাই এ সময় শরীর ঢেকে রাখা পোশাক পরা এবং ঘুমানোর সময় কয়েল বা মশারি ব্যবহার করা উচিত। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার।
তবে কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতাই ডেঙ্গু দমনে যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রয়োজন নগর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত কার্যক্রম। মশক নিধন অভিযানের নামে কেবল ধোঁয়া দেওয়া বা লোকদেখানো ওষুধ ছিটানো বন্ধ করে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কার্যকর কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে। ড্রেন, নালা ও জমে থাকা জলাশয়গুলোতে লার্ভিসাইড প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে।
ডেঙ্গু কোনো দৈবদুর্বিপাক নয়, এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধি। একা সরকারের পক্ষে যেমন পুরো শহরকে মশামুক্ত রাখা সম্ভব নয়, তেমনই সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া যেকোনো অভিযানই নিষ্ফল হতে বাধ্য। তাই ডেঙ্গুমুক্ত সুস্থ পরিবেশ গড়ে তুলতে ব্যক্তি সচেতনতার সাথে প্রশাসনিক সক্রিয়তার মেলবন্ধন এখন সময়ের দাবি।