মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
স্ক্যাম কম্পাউন্ডে পাচারের শিকার চার বাংলাদেশির মরদেহ ফিরবে বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে সামরিক সমাধান নেই, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বার্তা শ্রীলংকার ওয়ানডে দলে ফিরলেন আভিস্কা সবার জন্য নিরাপদ ও টেকসই বাসস্থান নিশ্চিতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ : প্রধানমন্ত্রী গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর : তথ্যমন্ত্রী চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন তিন বিজ্ঞানী ঘোড়াঘাটে বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৬ পালিত মাসকলাইয়ে স্বপ্ন বুনছেন যমুনা চরের কৃষকরা বগুড়ার শেরপুরে সমবায় দল নেতা পলাশের মায়ের মৃত্যু,বিভিন্ন মহলের শোক মালয়েশিয়া থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে ফিরেছেন প্রায় দেড় হাজার অভিবাসী

সংবাদপত্র বন্ধ করার দুর্মতি এল কোত্থেকে?

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট সময় : 11:37 pm, বৃহস্পতিবার, ৫ মে, ২০১৬

পয়লা মে প্রথম আলোর প্রথম পাতায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেল, প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের উদ্যোগ চলছে। প্রতিবেদক জানিয়েছেন, প্রেস কাউন্সিল নিজেই আইনটির একটা সংশোধিত খসড়া তৈরি করে মতামতের জন্য আইন কমিশনে পাঠিয়েছিল।
আইন কমিশন ওই খসড়া সম্পর্কে মতামত দিতে গিয়ে সুপারিশ করেছে, সংশোধিত আইনে এমন একটা ধারা যুক্ত করা হোক, যার বলে প্রেস কাউন্সিল কোনো সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার প্রকাশনা সর্বোচ্চ ৩০ দিন বন্ধ রাখার আদেশ দিতে পারবে।
খবরটা পড়ে বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবছি, আইন কমিশনের বিজ্ঞ চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মাথায় এমন অভিনব দমনমূলক পন্থার ভাবনা কেন উদয় হলো, কী করে উদয় হতে পারল! আইন কমিশনের চেয়ারম্যান মহোদয় দেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন, সদস্যদের একজন সাবেক বিচারপতি, আরেকজন আইনের অধ্যাপক। পৃথিবীর তাবৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম-সম্পর্কিত আইন-বিধানগুলো সম্পর্কে তাঁদের বিশদ ও গভীর জানা-বোঝা থাকার কথা। তাঁদের জানা থাকার কথা, প্রকাশনা বন্ধ করার এখতিয়ার প্রেস কাউন্সিল, প্রেস কমপ্লেইন্টস কমিশন বা এ ধরনের রেগুলেটরি সংস্থাকে দেওয়ার আইন দূরে থাক—এমন ভাবনারই কোনো অস্তিত্ব গণতান্ত্রিক বিশ্বে নেই।
এমনকি কোনো সংবাদপত্র যদি মিথ্যা, ভিত্তিহীন কোনো খবর প্রকাশ করে, কোনো কিছু প্রকাশের মাধ্যমে কারও মানহানি ঘটায়, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির কারণ ঘটায়, তাহলে ওই সংবাদপত্রের ওই সংখ্যাটির সব কপি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা ও বিপণন বন্ধ করার আইন আছে। কিন্তু ওই সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করার আইন পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে নেই। আমাদের দেশেও এমন কোনো আইন নেই, যার বলে কোনো কিছু প্রকাশের কারণে কোনো সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করা যায়। ৩০ দিন দূরে থাক, ১ দিনের জন্যও কোনো সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করা যায় না। ছাপাখানা প্রকাশনা (ঘোষণা ও নিবন্ধীকরণ) আইন ১৯৭৩-এ সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল করার যেসব শর্ত আছে, সেগুলোর কোনোটাই সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। যেমন কোনো সংবাদপত্রের মালিক, মুদ্রাকর কিংবা মালিক বা প্রকাশক একটা সময়ে আর বাংলাদেশের নাগরিক না থাকেন; তিনি বা তাঁরা যদি নৈতিক চরিত্রহীনতা-সংক্রান্ত কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হয়ে থাকেন; মুদ্রাকর বা প্রকাশক যদি আদালতের দৃষ্টিতে উন্মাদ বা অপ্রকৃতিস্থ প্রমাণিত হন; মালিক বা প্রকাশকের সংবাদপত্রটি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য না থাকে। কোনো সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল হতে পারে আরও একটা কারণে: সেই সংবাদপত্র দৈনিক হলে টানা তিন মাস, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক বা মাসিক হলে টানা ছয় মাস যদি প্রকাশিত না হয়। ছাপাখানার লাইসেন্স বাতিল করার বিধান আছে এবং কোনো সংবাদপত্রের ছাপাখানার লাইসেন্স বাতিল হলে সেটার প্রকাশনা বন্ধ হতে পারে, কিন্তু খোদ সংবাদপত্রটির প্রকাশনা বন্ধ করার সুযোগ এ দেশের কোনো আইনেই নেই।
সভ্য, গণতান্ত্রিক দুনিয়ার মানুষ সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ বা স্থগিত করার কথা ভাবতে পারে না। এর পেছনের একটা যুক্তি হলো এই: ধরা যাক, একটা দৈনিক সংবাদপত্র, আগামীকাল সেটির যে সংখ্যা প্রকাশিত হবে, তাতে কী ছাপা হবে, তা ওই সংবাদপত্রের কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কেউ জানে না; সরকার জানে না, আদালত জানেন না। তাহলে কী যুক্তিতে আগেই সেটার প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা হবে? এটা
করা যায় না। প্রকাশিত সংবাদপত্রের কপি বাজেয়াপ্ত করা যায়, এই সাংবাদিক বা ওই সাংবাদিকের ‘হলুদ সাংবাদিকতা’র বিচার করে শাস্তি দেওয়া যায়, জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া যায়, কিন্তু সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ বা স্থগিত করা যায় না। এ রকম ভাবনাই অস্বাভাবিক, সভ্য দুনিয়ার রীতিনীতির উল্টো।
এখন তাহলে প্রশ্ন: সাংবাদিক বা সংবাদপত্র যদি ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ করে, মিথ্যা, ভিত্তিহীন খবর ছাপায়, ঘৃণা ছড়ায়, সমাজে অশান্তি-বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি সৃষ্টির কারণ হয়, কারও মানহানি ঘটায়, কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে কি তার বিচার করা যাবে না? অবশ্যই যাবে এবং বিচার করে শাস্তি দেওয়ার জন্য একাধিক আইন আমাদের দেশে আছে; পৃথিবীর সব দেশেই আছে। আমাদের দেশে সেসব আইনে মামলা দায়েরের ঘটনাও ঘটে।
তাহলে প্রেস কাউন্সিল কেন আছে, আর সেটাকে সংবাদপত্র বন্ধ করার ক্ষমতা দেওয়ার ভাবনাই বা কেন এল? এই দুটি প্রশ্নের উত্তর হবে পরস্পর বিপরীতমুখী। কারণ, ‘প্রেস কাউন্সিল’ বলে যে কনসেপ্ট আমরা ১৯৭৪ সালে গ্রহণ করেছি, তার মর্মকথা হলো মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমকে স্বনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ-রেগুলেশনে সহায়তা করার মাধ্যমে ফৌজদারি আইনগুলো থেকে একধরনের সুরক্ষা দেওয়া। অর্থাৎ, দৃষ্টান্তস্বরূপ কোনো সংবাদপত্রে মিথ্যা, ভিত্তিহীন, কুৎসামূলক কিছু প্রকাশিত হলে তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সংক্ষুব্ধ হয়ে ফৌজদারি আইনে মামলা করার আগে, থানা-পুলিশের কাছে যাওয়ার আগে, প্রেস কাউন্সিলে নালিশ করবেন, প্রতিকার চাইবেন। প্রেস কাউন্সিল সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির অভিযোগ শুনবে, অভিযুক্ত সংবাদপত্রকে সেটা জানাবে, ব্যাখ্যা চাইবে, যাচাই করবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির অভিযোগ সঠিক কি না; সঠিক হলে সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্র/ সাংবাদিক/ সম্পাদকের জ্ঞাতসারে, ইচ্ছাকৃতভাবেই তা ঘটেছে কি না। প্রেস কাউন্সিলের যদি মনে হয় সংবাদপত্রটি সাংবাদিকতার নীতিমালা বা আচরণবিধির কোনো অংশের পরিপন্থী কিছু করেছে, তাহলে তাকে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির পাল্টা বক্তব্য প্রকাশ করতে বলবে, ভুল স্বীকার করে লেখা ছাপার নির্দেশ দেবে; সতর্ক, ভৎর্সনা, তিরস্কার করবে। এভাবে সাংবাদিকতা পেশার গুণগত মান বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিল সহযোগিতা করবে।
প্রেস কাউন্সিলকে সংবাদপত্র বন্ধ করার এখতিয়ার দেওয়ার ভাবনা আসলে প্রেস কাউন্সিলের ধারণা বা দর্শনকেই নাকচ করে দেয়। এ রকম বিপজ্জনক সুপারিশ এসেছে আইন কমিশনের কাছ থেকে—এটা বেশ উদ্বেগের বিষয়। এ দেশে সংবাদমাধ্যমকে দমন করার ফন্দিফিকির খোঁজেন সাধারণত ক্ষমতাসীন রাজনীতিকেরা। আইন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের মাথায় এই ভূত চাপল কী করে, তা দুর্ভাবনার বিষয়। ভালো কথা যে প্রেস কাউন্সিল নিজেই নাকি সংবাদপত্র বন্ধ করার এখতিয়ার চায় না। কিন্তু সংস্থাটি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা চেয়েছিল, কিন্তু আইন কমিশন তাতে সায় দেয়নি বলে জানা গেছে। আমাদের প্রেস কাউন্সিল বহু বছর ধরেই ক্ষমতার অভাবজনিত রোগলক্ষণে ভুগছে, এটা খুবই অস্বাভাবিক। পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশের প্রেস কাউন্সিল বাড়তি ক্ষমতা চায় না, বরং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষীয় ক্ষমতার দাপট থেকে সংবাদমাধ্যমকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে। ভারতের প্রেস কাউন্সিলের ওয়েবসাইট খুলে দেখুন কী লেখা আছে। প্রথম বাক্যেই বলা হয়েছে, ‘প্রেস কাউন্সিল হলো এমন একটা মেকানিজম, যার সাহায্যে মুদ্রিত সংবাদমাধ্যম নিজেকে নিজেই নিয়ন্ত্রণ করবে।’ সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও উচ্চ পেশাগত মান বজায় রেখে দায়িত্বশীলতা ও পেশাদারির সঙ্গে সংবাদপত্র চালাতে ব্যর্থ হলে তার প্রতিবিধানের ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু সেই প্রতিবিধান যদি হয় সরকার বা সরকারি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ, তাহলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকে না। তাই সংবাদমাধ্যমের স্বনিয়ন্ত্রণের চর্চার বিকাশ ঘটাতে কাজ করে প্রেস কাউন্সিল।
আমাদের সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলে, আবার সেই স্বাধীনতা কীভাবে কমানো যায় তারও উপায় খোঁজে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন অত্যন্ত কঠোর, প্রায় একটা কালাকানুন: ইন্টারনেটভিত্তিক সাংবাদিকতা বিকাশের পথ রুদ্ধ করেছে এ আইন। যে সম্প্রচার আইন গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে, সেটারও মূল স্পিরিট নিয়ন্ত্রণমূলক, সম্প্রচারমাধ্যমের সুরক্ষামূলক নয়। ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইন পুরোনো আইন হওয়ায় এতে মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমের কিছু সুরক্ষা আছে। এই সুরক্ষাকে অর্থহীন করে দেওয়ার জন্যই বুঝি–বা প্রেস কাউন্সিলকে সংবাদপত্র বন্ধ করার ক্ষমতা দিয়ে প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে।
মিডিয়া-দমনের প্রবল তাড়নায় মরিয়া সরকারই কি তবে আইন কমিশনের এই দুর্মতির উৎস?
মশিউল আলম: সাংবাদিক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই রকম আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2017 Cninews24.Com
Design & Development BY Hostitbd.Com