মানসিক ভারসাম্যহীন ২৭ বছর বয়সী শাহান আলী। প্রায় ২১ বছর ধরে পায়ে শিকল ও হাতে দড়ির বাঁধনে বন্ধী জীবন কাটাচ্ছেন। দিনের বেলায় বসতঘরের পেছনে খোলা আকাশের নিচে গাছের সঙ্গে ও রাতে ঘরের ভিতর খুটির সঙ্গে দু’হাতে ও দুথপায়ে শিকল দিয়ে তাকে বেঁধে রাখা হয়। সেখানেই চলে তার খাওয়া-দাওয়া আর প্রসাব-পায়খানা। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে চলছে শাহানের বন্দি জীবন।
সে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার চন্ডিগড় ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের থাপনারগাতি গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ মিয়ার ছেলে। দুই ভাই এর মধ্যে শাহান আলী ছোট। দুথপায়ে শিকল ও দু’হাতে দড়ির বাঁধন যেন নিত্যদিনের সঙ্গি হয়ে দাড়িঁয়েছে তার। জন্মের ৬ বছর বয়স থেকেই পায়ে শিকল ও হাতে দড়ি বাঁধা হয়ে প্রায় ২১ বছর ধরে মানবেতর জীবনযাবন করছেন ওই যুবক। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসা করিয়েও কোনো লাভ হয়নি বলে জানায় পরিবার। তবে অর্থের অভাবে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেনি তারা।
আজ (০৪ মে) বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বসতঘরের পেছনে খোলা আকাশের নিচে গাছের সঙ্গে দু’হাতে ও দু’পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে মানসিক ভারসাম্যহীন শাহানকে। তাকে সারাদিন এখানেই বেঁধে রাখা হয় বলে জানায় বাবা আব্দুল মজিদ আলী।
শাহান আলীর বাবা আব্দুল মজিদ আলী জানান, ১৯৯৬ সালের ১৩ নভেম্বর শাহান আলীর জন্ম। জন্মের প্রায় ৬ বছর বয়স হওয়ার পর থেকেই তার মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ শুরু হয়। সে সময় তাকে ছেড়ে দিলে ছোটাছুটি করে যাকে সামনে পেত তাকেই মারধর করত। এলাকাবাসীর গরু, হাস, মুরগি, ছাগলদেরও মারধর করাসহ পরিবারের লোকজনদেরও কাছে পেলে আঘাত করার চেষ্টা করত। যতই বড় হচ্ছিলো অস্বাভাবিক আচার-আচরণ, মারধর দিন-দিন বাড়তে থাকে। পরে সামর্থ্য মতো কিছুদিন চিকিৎসা চালালেও সুস্থ হয়নি শাহান আলী। তার আচরণের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং দিন দিন বাড়তেই থাকে। তাই অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা এড়াতে বাধ্য হয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বেঁধে রাখা হচ্ছে তাকে।
শাহানের মা রহিমা খাতুন বলেন,জন্মের পরদিনই শাহানের খেঁচুনি হয়। এরপর আমরা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করালে সুস্থ হলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যায় তার মাঝে। বয়স যখন ছয় তখনি মানুষকে মারধর শুরু করে। বড় দূর্ঘটনাও ঘটিয়েছে। এজন্যই তাকে রাতে ঘরের ভিতর খুটির সঙ্গে এবং সকালে বাড়ির সামনে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে সেখানেই খাবার দেওয়া হয়।
তিনি কান্নায় জর্জরিত কন্ঠে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে হাতে পায়ে বেঁধে রেখেছি সন্তানকে। দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখায় হাত ক্ষত হয়ে গেছে। এই দৃশ্য মা হয়ে সহ্য করতে পারছি না।
এলাকাবাসীদের একজন বলেন, ‘আমি ছোট থেকেই দেখে আসছি এরকম শিকলে বাধা অবস্থায়। প্রস্রাব পায়খানা এলে চিৎকার শুরু করে পরে পলিথিন দিলে সেখানে পায়খানা করে এরপর তার মা অথবা বাবা পরিষ্কার করেন। তার বাবা-মা সারাদিন এ ছেলের কথা ভেবে কান্নাকাটি করে।’
সরকারি সহায়তায় উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে হয়তো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারত বলে জানায় তার পরিবার।