
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশলের মূল কথা একটাই— প্রচারে ট্রাম্পকেই সামনে রাখা। তবে জনমত জরিপে তার জনপ্রিয়তা ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় এ কৌশল রিপাবলিকানদের সহায়তার বদলে ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
আগামী ৩ নভেম্বরের ভোট সামনে রেখে গত এক মাস ধরে প্রচারাভিযানে ঝড় তুলেছেন ট্রাম্প। প্রায় প্রতিদিনই দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে গিয়ে সমাবেশ করছেন তিনি। তার দৃঢ় বিশ্বাস, কেবল তিনিই ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ শিবিরের সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে পারেন।
এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে ডেমোক্র্যাটদের কমিউনিস্ট কিংবা ‘ট্রান্সজেন্ডারদের বিকৃত করার’ সমর্থক হিসেবে আখ্যায়িত করে অপমানজনক মন্তব্য ও রিপাবলিকানরা জিতলে নগদ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। জনমত জরিপের পূর্বাভাস উপেক্ষা করে নির্বাচনে জয়ের পথ হিসেবে ট্রাম্প এ কৌশলই নিয়েছেন।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক পিটার লোগে এএফপি’কে বলেন, ‘ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, রিপাবলিকানদের সব সমস্যার সমাধান তার হাতেই রয়েছে। তাই তার কথা শুনতে আগ্রহী সবার কাছে নিজের বক্তব্য পৌঁছে দিতে তিনি মরিয়া।’
গত সেপ্টেম্বরে ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির বিরল মধ্যবর্তী নির্বাচনবিষয়ক সম্মেলনেও ট্রাম্প বিষয়টি স্বীকার করেন।
২০১৬ সালে আকস্মিক নির্বাচনী জয় থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন— এ সবই তার আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি।
তবে এবার সমস্যা হলো, সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ১৯৪৬ সালের পর মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দায়িত্ব পালনকারী কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা এতটা কম ছিল না।
লোগে বলেন, ‘সব দিক বিবেচনায় নির্বাচনী প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতি সম্ভবত রিপাবলিকানদের ক্ষতি করবে। এর একটি কারণ হলো, মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল ভালো করে না। অন্য কারণটি হলো, ট্রাম্প ঐতিহাসিকভাবেই অজনপ্রিয়।’
ট্রাম্প তার সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে আনতে পারলেও তাতে নির্বাচনী ফল বদলে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ভোট নাও মিলতে পারে। লোগের ভাষায়, ‘ট্রাম্পের প্রতি নিবেদিত ভোটারদের সংখ্যা পার্থক্য গড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।’
ডেমোক্র্যাটদের ‘নীল ঢেউয়ে’ প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট— কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় রিপাবলিকানদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে তাদের মরিয়া মনোভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ট্রাম্প তার প্রচারসূচি পরিবর্তন করে বারবার এমন সব অঙ্গরাজ্যে সমাবেশ করছেন, যেগুলোকে একসময় রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এর মধ্যে টেক্সাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মধ্যবর্তী নির্বাচনে তিনি ৪০০ মিলিয়ন ডলার প্রচারে ব্যয় করবেন বলেও জানিয়েছেন।
কঠোর ভাষা ও ব্যক্তিগত আক্রমণ-
নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পের বক্তব্যেও এ মরিয়া মনোভাবের প্রতিফলন ঘটছে।
প্রচারণা যত এগিয়েছে, তার অনিয়ন্ত্রিত বক্তব্যে বিভাজনমূলক ও সহিংস ভাষার ব্যবহার তত বেড়েছে।
মিশিগানে ডেমোক্র্যাটদের মুসলিম ও বামপন্থী সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদকে তিনি ‘জিহাদি’ আখ্যা দিয়েছেন। অন্য এক ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে নিয়ে ট্রান্সজেন্ডারবিরোধী অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করেছেন। ডেমোক্র্যাটদের কমিউনিস্ট বলেছেন এবং সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে আক্রমণও জোরদার করেছেন।
কখনো কখনো তিনি অদ্ভুত ও অপ্রাসঙ্গিক বিষয়েও কথা বলছেন।
ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকেরা তার উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও সাধারণ রিপাবলিকান ভোটাররা এতে বিরক্ত হতে পারেন। ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিতে অনিচ্ছুক হলেও তারা ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
অর্থের প্রতিশ্রুতি, বাড়তি জটিলতা-
ট্রাম্পের আরেকটি কৌশল হলো অর্থের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা। তবে এ প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন শর্তসাপেক্ষে— রিপাবলিকানরা জিতলেই তা কার্যকর হবে।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানরা ধরে রাখতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে ৫ হাজার ডলার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তবে এ অর্থ দেওয়া আইনসম্মত হবে কি না এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় এক ট্রিলিয়ন ডলার কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিনিই সন্দেহ করছেন যে তারা আদৌ এ ৫ হাজার ডলার পাবেন।
ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির উচ্চমূল্যে ক্ষতিগ্রস্ত ভোটারদের জন্যও বিভিন্ন সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ট্রাম্প। এর মধ্যে রয়েছে কৃষকদের আর্থিক সহায়তা ও সীমান্তবর্তী শহরগুলোর সুবিধার্থে কানাডার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা।
তবে তেলের দাম কমাতে তার উদ্যোগ মিশ্র ফল দিয়েছে। ইরান যুদ্ধ কার্যত অচলাবস্থায় পড়েছে। এদিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইসরাইলের সঙ্গে নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়টি ট্রাম্প বিবেচনা করছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহসংক্রান্ত একটি চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে নির্বাচনের পর তিনি কী করবেন, তা।
২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি যেভাবে ফল চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, এবারও একইভাবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানাবেন কি না, তা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ভোট জালিয়াতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার মতো তথ্য দিলে এক মিলিয়ন ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে।
গত সপ্তাহে তিনি আগাম আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে রিপাবলিকান দলীয় বর্তমান সিনেটর হেরে গেলে আলাস্কার সিনেট নির্বাচনের ফল আটকে দেওয়া যায়।