
ক্যারিয়ারে নিজের সাথে যুদ্ধের পাশাপাশি মাঠের লড়াইটাও কম ছিলনা। বিশেষ করে ফর্মের তুঙ্গে থেকেও জাতীয় দল কিংবা ক্লাব কোন পর্যায়েই শিরোপার ঘাটতি হ্যারি কেইনকে কিছুটা হলেও অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে দিয়েছিল। তারপরও থেমে থাকেননি, প্রতিটি ম্যাচই যেন কেইনের জন্য নিজেকে আরও একটু ছাড়িয়ে যাবার লড়াই ছিল। আর শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত সেই স্বীকৃতির যথাযোগ্য মর্যাদা পেলেন ইংলিশ অধিনায়ক।
ব্যালন ডি’অর জয় হ্যারি কেইনের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ও ধারাবাহিকতার তুলনায় শিরোপার সংখ্যা মোটেই সমৃদ্ধ ছিলনা। এই পুরস্কার যেন সেই ঘাটতিও পূরণ করল।
৩৩ বছর বয়সী বায়ার্ন মিউনিখের এই স্ট্রাইকার ২০০১ সালে মাইকেল ওয়েনের পর প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্খিত ব্যক্তিগত সম্মান জিতেছেন।
কেইনের পরিসংখ্যান অবিশ্বাস্য। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও ধারালো হয়ে উঠছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক। গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে করেছেন ৭৩ গোল।
সেপ্টেম্বরে বুন্দেসলিগায় দ্রুততম ১০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। বায়ার্নের হয়ে মাত্র ৯৮তম লিগ ম্যাচেই এই কীর্তি গড়েন কেইন।
টটেনহ্যাম হটস্পারের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি, ক্লাবটির হয়ে করেছেন ২৮০ গোল। ইংল্যান্ডের হয়েও সর্বোচ্চ ৯১ গোল তাঁর। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সর্বোচ্চ গোল করা ইংলিশ খেলোয়াড়ও কেইন, তাঁর গোলসংখ্যা ৫৮।
তবে ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে ব্যক্তিগত সাফল্যের পরও ২০২৩ সালে বায়ার্নে যোগ দেওয়ার পর থেকে তাঁর শিরোপার তালিকায় রয়েছে কেবল জার্মানির ঘরোয়া প্রতিযোগিতার সাফল্য।
২০১৯ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে লিভারপুলের কাছে হারা টটেনহ্যাম দলের সদস্য ছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডের হয়েও দুবার ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে হারের অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর।
কেইনের গোল করার অসাধারণ দক্ষতাই তাঁর একমাত্র শক্তি নয়। যুবদলে খেলার সময় থেকেই পাস দেওয়ার যে সহজাত দক্ষতা গড়ে তুলেছিলেন, সময়ের সঙ্গে তা আরও শাণিত হয়েছে। এখন তিনি একজন দক্ষ প্লেমেকার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
উয়েফা ডটকমকে কেইন বলেন, “আমার মনে হয়, পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই পাস দেওয়ার দক্ষতা, দূরদৃষ্টি, ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা ও খেলা বোঝার ক্ষমতা আমার ছিল। বিশেষ করে বায়ার্নে আসার পর গত কয়েক বছরে এসব গুণ আরও বিকশিত হয়েছে।
শৈশবের প্রেমিকা কেটি গুডল্যান্ডকে বিয়ে করা, পরিপাটি ব্যক্তিত্বের অধিকারী কেইন বর্তমান ফুটবলের চাকচিক্যপূর্ণ সংস্কৃতির যুগে কিছুটা পুরোনো ধাঁচের ব্যতিক্রমী তারকা।
তবে ক্যারিয়ারের শুরুটা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। টটেনহ্যামে প্রথম দিকে নিজেকে মেলে ধরতে সংগ্রাম করতে হয়েছে তাঁকে। একপর্যায়ে ধারে খেলতে হয়েছে অন্য ক্লাবেও।
২০১১ সালে শ্যামরক রোভার্সের বিপক্ষে টটেনহ্যামের হয়ে প্রথম গোল করার পর দ্বিতীয় গোলের জন্য প্রায় দুই বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল তাঁকে। পরের গোলটি করেন ২০১৩ সালে হালের বিপক্ষে।
২০১৪-১৫ মৌসুমে দারুণ সাফল্যের পরও তাঁকে ‘এক মৌসুমের বিস্ময়’ বলে কটাক্ষ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর ধারাবাহিক সাফল্য সেই মন্তব্যকে ভুল প্রমাণ করেছে।
বায়ার্নের কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানি কেইনের পাস দেওয়ার দক্ষতা, পরিশ্রম এবং ‘খেলা বোঝার বুদ্ধিমত্তাসহ’ নানা গুণের প্রশংসা করেছেন।
কোম্পানি বলেন, “খেলার এই দিকগুলোর সঙ্গে তাঁর গোলের পরিসংখ্যানও ধরে রাখতে হলে কিছুটা ভিন্নভাবে আমাকে পরিকল্পনা সাজাতে হয়। আবার গোল করার জন্য বক্সেও পৌঁছাতে হয়। কাজটি মোটেও সহজ নয়।
“আমরা তাঁর মধ্যে এই গুণ দেখেছি এবং উপভোগ করতে পেরেছি। ইংল্যান্ডে তাঁর সময়ে হয়তো এই দিকটি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে তিনি আরও পরিণত হচ্ছেন। বায়ার্নের হয়ে তাঁর খেলার এই দিকটি দেখেও আমি আনন্দ পাচ্ছি।”
বায়ার্নে কেইনের সতীর্থ জোনাথন টাহ কাছ থেকে তাঁর অসাধারণ কর্মনিষ্ঠা দেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
দ্য টাইমসকে টাহ বলেন, “আমি তাঁর বিপক্ষে অনেকবার খেলেছি। প্রতিবারই তাঁকে আরও ভালো হতে দেখেছি। এখন তাঁর সঙ্গে খেলছি, তাই বুঝতে পারছি।
“তিনি কখনোই সন্তুষ্ট হন না। অনুশীলনের আগে ও পরে তাঁকে কাজ করতে দেখা যায়। জীবনে দেখা সেরা গোলস্কোরার তিনি, তবু এখনো নিজের উন্নতির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।”