এবার বর্ষা শুরু হবার আগেই সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নের যমুনা পাড়ের মানুষের মাঝে নদী ভাঙনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। কারণ গতবার ওই এলাকায় নদী ভাঙনের কারণে নদীর গভীরতা বেড়ে তীরবর্তী এলাকায় অনেক উঁচু খাড়া পাড়ালের সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে পানি বাড়ার সাথে সাথে স্রোতে ওই এলাকায় ব্যাপক আকারে নদী ভাঙন দেখা দিতে পারে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ফলে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন যমুনার তীরবর্তী এলাকার মানুষজন। তারা আগে থেকেই জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও কাজিপুর উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতি সেলিম রেজা নদী ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে লোকজনের খোঁজখবর নেন এবং ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। নদী তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়ার সময় তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ আকারে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছিল। ওই সময় সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরিভাবে কিছু জিওব্যাগ ফেলেও ভাঙন রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদী ভাঙনের কবলে পড়ে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনেকেই।
গতবারের ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী বা অস্থায়ী প্রয়োজনীয় কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে এবার বর্ষা শুরু হবার আগেই ভাঙন আতঙ্কে মহাচিন্তিত রয়েছেন যমুনা নদী তীরের বাসিন্দারা। কারণ এ বছর নদীর ওই তীরবর্তী এলাকায় নদীর গভীরতা অনেক বেড়ে উঁচু খাড়া পাড়ালের সৃষ্টি হয়েছে। এখন থেকেই পানির ঢেউয়ের আঘাতে ভাঙতে শুরু করেছে। বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়ার সময় স্রোতে আরও বড় ধরনের নদী ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এমতাবস্থায় বর্ষা আসার আগেই জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন নদী পাড়ের লোকজন।
স্থানীয়রা জানান, এবার শুষ্ক মৌসুমেও থেমে থাকেনি নদী ভাঙন। চরাঞ্চলের নাটুয়ারপাড়া, খাসরাজবাড়ী, তেকানী, নিশ্চিন্তপুর, মনসুর নগর ও চরগিরিশ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্ৰামে পানির ঢেউয়ের আঘাতে অল্প অল্প করে তীরবর্তী এলাকায় ভাঙছে। বর্ষা আসার দুই মাস আগে থেকেই এবার নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। হুমকির মুখে রয়েছে নাটুয়ারপাড়া থেকে তেকানী বাঁধ পর্যন্ত। রাস্তা-কাম নাটুয়ারপাড়া ও তেকানী ইউনিয়ন রক্ষাবাঁধ পর্যন্ত পাকা রাস্তা। এটি একেবারেই নদীর তীরঘেঁষা রাস্তা। এ এলাকার মধ্যে হাট বাজার, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ ও কবরস্থানসহ বহু অবকাঠামো রয়েছে। এ ছাড়া যমুনার তীরবর্তী এলাকায় বহু মানুষের বাড়িঘর রয়েছে। এসব বাড়িঘরও হুমকির মুখে।
ভাঙন কবলিত এলাকার বাসিন্দারা আরও জানান, প্রতি বছরই বর্ষার সময় ভাঙন দেখা দেয়। ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে অনেকেই নিঃস্ব জীবন কাটাচ্ছেন। নদীতে স্থায়ী বাঁধের দাবিতে বিভিন্ন সময় মানববন্ধন করেছেন তারা। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতরে আবেদন করা হয়েছে। তারপরও অদ্যাবধি স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। যমুনা নদীর স্রোত এবং অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে খাসরাজবাড়ী, নাটুয়ারপাড়া ও তেকানী ইউনিয়নের আশপাশের এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। পাশাপাশি নাটুয়ারপাড়া লঞ্চ, স্পিডবোট ঘাট ও তেকানী নৌকা ঘাট এবং বাজার হুমকির মুখে পড়বে।
দুর্গম চরাঞ্চলের খাসরাজবাড়ী ও তেকানী ইউনিয়নের মানুষ বেশি অবহেলিত বলে মন্তব্য করে কাজিপুর উপজেলা বিএনপি’র সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবু বলেন, খাসরাজবাড়ী এলাকা থেকে নাটুয়ারপাড়া বাজার হয়ে তেকানী ইউনিয়ন পর্যন্ত বিশাল এলাকাজুড়ে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নেই। এ কারণে প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে যমুনার ভাঙনের শিকার হতে হচ্ছে। নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে মানুষের বাড়িঘর ও ফসলি জমি। এ ভাঙন রোধে স্থানীয়রা একাধিকবার মানববন্ধন করেছেন। কিন্তু অদ্যাবধি প্রয়োজনীয় স্থায়ী কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমতাবস্থায় উক্ত এলাকায় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের জোর দাবি জানান তিনি।
নাটুয়ারপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল লতিফ সরকার জানান, এবার বর্ষা শুরু হবার আগেই চর এলাকায় নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। গতবারের ভাঙনে এবার নদীর গভীরতা বেড়ে তীরবর্তী এলাকায় অনেক উঁচু খাড়া পাড়ালের সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে ঢেউয়ের আঘাতে এখন থেকেই নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে নদী পাড়ের মানুষের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ ব্যাপারে আমরা সংসদ সদস্যকে অবহিত করলে তিনি উক্ত ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং এলাকার লোকজনের খোঁজখবর নেন। ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি।
এদিকে নাটুয়ারপাড়া, তেকানী, চরগিরিশ, নিশ্চিন্তপুর, খাসরাজবাড়ী ইউনিয়নের গ্রামের তীরবর্তী এলাকার বেশ কিছু অংশ নদীগর্ভে চলে গেছে। এখানেও যমুনা নদীর পাড়ে পানির গভীরতা অনেক বেশি। ফলে স্রোত একেবারে কিনারায় এসে লাগছে বলে স্থানীয়রা জানান। পানির ঢেউয়ে নদীর পাড়ের তিন ফসলি জমি একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে। এভাবে ভাঙতে থাকলে পুরো এলাকা নদীগর্ভে চলে যাবে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন। এখানেও ভাঙনের আতঙ্কে দিন-রাত কাটাচ্ছেন গ্রামবাসী। এ ছাড়া চরাঞ্চলে অবস্থিত ছয়টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাসমূহের সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাসহ বাড়িঘর ও ফসলি জমি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, অস্থায়ীভাবে নদী ভাঙন রোধে সেখানে জিওব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করা হবে। তবে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধের জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জানানো হবে।