
দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব কিংবা কোনো ধরনের অপকর্মে জড়ালে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। সে নেতা-কর্মী হোক কিংবা মন্ত্রী-এমপি, অন্যায় করলে সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে।
বিএনপির সংসদ সদস্যদের এমন কঠোর বার্তা দিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনপ্রিয় ও যোগ্য প্রার্থী বাছাই এবং দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় এমপিদের সক্রিয় ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
রবিবার (১১ অক্টোবর) রাতে জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে এসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন তারেক রহমান। বৈঠকে সরকারের আট মাসের কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা, নির্বাচনী এলাকার সমস্যা, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রায় তিন ঘণ্টার এ বৈঠকে মন্ত্রিসভার সদস্য ও সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ড. মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানসহ সরকারদলীয় একাধিক সংসদ সদস্য বক্তৃতা করেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক সংসদ সদস্য জানান, সরকার গঠনের পর গত ৮ মাসে কোন খাতে কী কাজ হয়েছে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অগ্রগতি কতটুকু এবং বাস্তবায়নে কী ধরনের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে, তা জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার সমস্যা, মানুষের প্রত্যাশা এবং সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার কথাও শোনেন তিনি।
সরকারের কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা জানা এবং জনপ্রতিনিধিদের মানুষের কাছে দায়বদ্ধ থাকার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পায়। সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখে তাদের সমস্যা সমাধানে কাজ করার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি দলের নাম ব্যবহার করে অন্যায়-অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বৈঠকে স্পষ্ট করেন। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কেউ যাতে দল বা সরকারকে বিব্রত করতে না পারে, সে বিষয়ে নেতা-কর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক করেন।
বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।
বিএনপির নাম ব্যবহার করে কেউ অন্যায় করলে পার পাবে না। চাঁদাবাজ ও দখলদারদের কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, বৈঠকে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রধানমন্ত্রী তাগিদ দিয়েছেন। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনপ্রিয় ও যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে, যাতে জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচন নিরপেক্ষ হতে হবে। কারচুপির অভিযোগ তুলে কাউকে কোনো ইস্যু সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না।
দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের জনগণের পাশে থাকার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে জানান, সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া। তিনি জানান, বৈঠকে এমপিরা তাদের নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের জনগণের সঙ্গে থেকে, জনগণের জন্য কাজ করার এবং দলের সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। মানুষের সন্তুষ্টি অর্জন ও এলাকার সমস্যা সমাধানে জনপ্রতিনিধিদের আরো মনোযোগী হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক সূত্র জানায়, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জনপ্রিয়, যোগ্য ও স্থানীয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী মনোনয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে কোনো ধরনের অনিয়ম কিংবা হস্তক্ষেপ না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূলের সঙ্গে সমন্বয় করে একক প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা করবে বিএনপি। এ জন্য ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক কাঠামো কাজে লাগানো হবে। স্থানীয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রার্থী করার বিষয়ে গুরুত্ব দেবে দল। তিনি বলেন, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না। বিএনপি চায়, নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হোক এবং স্থানীয় মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। তৃণমূলের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে তাঁর বিষয়ে দল সিদ্ধান্ত নেবে। তবে এ নিয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো আলোচনা হয়নি।
নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের বিষয়ে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, সাধারণত স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে উপযুক্ত সময়ে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সংসদ সদস্যরা জানান, আসন্ন দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন নিশ্চিত করতে সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পূজাকে কেন্দ্র করে কেউ যাতে ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। দুর্গাপূজাকে ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়টি সরকারের পাশাপাশি দলীয় পর্যায়েও গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও প্রশাসনের পাশাপাশি বিএনপির নেতা-কর্মী, সমর্থক এবং সংসদ সদস্যরাও এ বিষয়ে কাজ করবেন। পূজার সময় কোথাও যেন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বৈঠকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও আলোচনা হয়। জনগণের অর্থের প্রতিটি পয়সা দেশের স্বার্থে ব্যয় নিশ্চিত করতে সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি, স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সমস্যা এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়। এ ছাড়া জাপানের শীর্ষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মারুবেনি করপোরেশনের বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, দ্বিতীয় কাফকো স্থাপন এবং জাতীয় বন্দর কৌশল প্রণয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক ও দায়িত্বশীল থাকার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় সজাগ থাকা এবং সরকারের কার্যক্রমের সঙ্গে দলীয় সাংগঠনিক তৎপরতার সমন্বয় রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।