বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪০ পূর্বাহ্ন

ইরানের নয়া সিদ্ধান্ত, মধ্যপ্রাচ্য কি পরমাণু বোমা বানানোর পথে?

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট সময় : 5:14 pm, বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক

পারমাণবিক অপ্রসারণ চুক্তি (এনপিটি) থেকে ইরানের সম্ভাব্য সরে আসার ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হামলা এবং ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে তেহরান এখন খতিয়ে দেখছে, এনপিটিতে বহাল থাকা তাদের মূল জাতীয় স্বার্থ আদৌ রক্ষা করছে কি না। বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলকে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

তেহরানের রাজনীতি ও প্রশাসনিক অলিন্দে পারমাণবিক অপ্রসারণ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। সম্প্রতি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাঘাই প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, এনপিটি ত্যাগের বিষয়টি সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। তেহরানের পক্ষ থেকে এমন আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রকাশের পর বিষয়টিকে কেবল উগ্রপন্থী বা কট্টরপন্থী অংশের ফাঁপা হুমকি হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদিও বাঘাই একই সাথে আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রতি ইরানের বিদ্যমান দায়বদ্ধতার কথা পুনরুল্লেখ করেছেন, তবুও চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান।

ইরানের নীতি নির্ধারকদের প্রধান অসন্তোষের জায়গা হলো, এনপিটি চুক্তিতে থাকা সত্ত্বেও ইরানকে কেন প্রতিনিয়ত একের পর এক ছাড় দিতে হচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাদের আইনগত সুযোগ-সুবিধা ও অধিকারগুলোকে বার বারবার দর কষাকষির বিষয়ে পরিণত করা হয়। নিজ পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে শান্তিপূর্ণ বলে বারবার দাবি করলেও ইরানের ওপর বাহ্যিক চাপ অব্যাহত রাখা হয়েছে। এর ফলে তেহরান এখন এনপিটির কার্যকারিতা ও সুফল নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তুলছে। তেহরান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক এই চুক্তিতে তাদের বহাল থাকা কোনোভাবেই শর্তহীন হতে পারে না।

মূলত ১৯৬৮ সালে প্রণীত এনপিটি কাঠামোর লক্ষ্য ছিল অধিকার ও দায়িত্বের মধ্যে একটি বৈশ্বিক ভারসাম্য বজায় রাখা। যেখানে অ-পারমাণবিক রাষ্ট্রগুলো পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ থেকে বিরত থাকবে এবং বিনিময়ে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি পাবে। অন্যদিকে পারমাণবিক পরাশক্তিগুলো বিশ্বকে সম্পূর্ণ পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাবে। তবে তেহরানের দৃষ্টিতে এই ভারসাম্য পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রযুক্তির অধিকার বজায় রাখা আর আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের নামে নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতাকে পুরোপুরি ত্যাগ করার দাবির মধ্যে যে সূক্ষ্ম ফারাক রয়েছে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ক্রমেই মুছে ফেলছে বলে বিশ্বাস করে তেহরান।

এই আস্থার সংকটকে আরও তীব্র করেছে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ)। চুক্তির শর্ত মেনে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যাপক সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নজিরবিহীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা মেনে নিয়েছিল। আন্তর্জাতিক পরিদর্শকরা ইরানের চুক্তির শর্ত পালনের সত্যতা নিশ্চিত করা সত্ত্বেও ২০১৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনরারোপ করে। শর্ত মেনে চলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল না পাওয়ার এই তিক্ত অভিজ্ঞতা ওয়াশিংটনের সাথে যেকোনো নতুন সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে তেহরানকে গভীরভাবে দ্বিধান্বিত করে তুলেছে।

এর পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এমনকি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নজরদারিতে থাকা অবস্থায়ও ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা ও হামলার চেষ্টার মতো ঘটনা ঘটেছে। এটা প্রমাণ করে যে এনপিটি সদস্যপদ আন্তর্জাতিক সামরিক হামলা বা নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান গ্যারান্টি প্রদান করে না। ইরানি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে চলেও যদি নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক হামলা বন্ধ না হয়, তবে এনপিটিতে থেকে যাওয়ার সপক্ষে কোনো বাস্তব যুক্তি অবশিষ্ট থাকে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান ভারসাম্যহীনতা। প্রতিবেশী দেশ ইসরায়েল এনপিটি চুক্তির স্বাক্ষরকারী নয়, ফলে তাদের ওপর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কোনো বাধ্যতামূলক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নেই। তেহরানের প্রশ্ন হলো, এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেও যেখানে ইসরায়েল অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে এবং কোনো জবাবদিহিতার মুখোমুখি হচ্ছে না, সেখানে চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ইরান কেন নানাবিধ বিধিনিষেধ এবং নিরাপত্তা হুমকির মুখে থাকবে। এই অসম নীতি ইরানের অভ্যন্তরে চুক্তি বিরোধীদের হাতকে শক্তি যোগাচ্ছে।

অবশ্য আইএইএ-এর দৃষ্টিভঙ্গিও ভিন্ন। পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকার, পারমাণবিক উপকরণের অবস্থান ট্র্যাকিং এবং সুবিধাসমূহে প্রবেশের ক্ষেত্রে ইরানও নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি অভিযোগ তুলে আসছে। এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এখনও আলোচনার পথ খোলা রাখছে এবং আশা করে যে আন্তর্জাতিক চাপ বা হুমকির বদলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই সমস্ত মতপার্থক্য নিরসন করা উচিত।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এনপিটি ত্যাগের এই প্রকাশ্য আলোচনা প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার একটি কৌশল হতে পারে। চুক্তি ত্যাগ করলে আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের আইনগত ভিত্তি নষ্ট হবে, যা অঞ্চলটিকে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে। এই হুমকি প্রদর্শন করে তেহরান মূলত ওয়াশিংটনকে একটি নমনীয় চুক্তিতে আসতে বাধ্য করতে চায়। তবে তেহরান চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করছে না; দেশের সর্বাধিনায়ক আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সিদ্ধান্তের ওপরই এর চূড়ান্ত নির্ভরতা রয়েছে।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তেহরান সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে। এনপিটি থেকে বের হলে রাশিয়া, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা হিসাব-নিকাশ করা হচ্ছে। একই সাথে এটি এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ চাল, যা মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক দৌড় শুরু করতে পারে। বিশেষ করে তুরস্ক এবং সৌদি আরব এই পদক্ষেপের পর নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোগী হতে পারে। যদি ইরান পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে তাদের প্রতিবেশীরাও নিজেদের সুরক্ষায় একই পথ অবলম্বন করবে। নিজের নিরাপত্তা বাড়াতে গিয়ে ইরান চারপাশে নতুন পারমাণবিক হুমকির মুখোমুখি হতে পারে, যা তেহরানের নীতিনির্ধারকরা ভালোভাবে অবগত আছেন।

এমতাবস্থায় মস্কোর দেওয়া একটি নতুন প্রস্তাব বিবেচনা করছে তেহরান, যেখানে নিজেদের অতিরিক্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় রপ্তানি করার কথা বলা হয়েছে। ইরান এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেনি, তবে শর্ত দিয়েছে যে এর বিনিময়ে তাদের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি সরাতে হবে এবং তাদের সার্বিক সুরক্ষার গ্যারান্টি দিতে হবে।

সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অপ্রসারণ চুক্তিতে ইরানের অবস্থান এখন এক গভীর সংকটের মুখে। তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা কেবল এককভাবে বিধিনিষেধ মেনে চলবে না যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে। কূটনৈতিক দর কষাকষির এই খেলা যদি কোনো যৌক্তিক সমাধানে না পৌঁছায়, তবে এনপিটি থেকে ইরানের আনুষ্ঠানিক প্রস্থান কেবল সময়ের ব্যাপারে পরিণত হতে পারে; আর এমনটা ঘটলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক চিত্র চিরতরে বদলে দিতে পারে।

সূত্র: আরটি

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই রকম আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2017 Cninews24.Com
Design & Development BY Hostitbd.Com