
যমুনার গর্জন যেন এখন আতঙ্কের আরেক নাম। দিন-রাত নদীর দিকে তাকিয়ে থাকেন সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের ভেটুয়া ও চরগিরিশ চরের মানুষ। কখন যে নদী এসে গিলে খাবে শেষ আশ্রয়টুকু, সেই শঙ্কায় নির্ঘুম কাটছে তাদের রাত। জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা চরগিরিশ ইউনিয়নের ভেটুয়া ও চরগিরিশ এই চরে একসময় প্রায় ৫০০ পরিবারের বসতি ছিল। কিন্তু অব্যাহত নদীভাঙনের কারণে ইতিমধ্যে প্রায় দেড়শ পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। গত সাত দিনেই নতুন করে অন্তত ৩০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে যেভাবে ভাঙন চলছে, তাতে আরও অন্তত ১০০ পরিবার, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাজার হুমকির মুখে রয়েছে।
গত রবিবার ও সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর তীরজুড়ে আতঙ্ক আর হাহাকার। কেউ ঘরের টিন খুলছেন, কেউ বাঁশ-কাঠ সরিয়ে নিচ্ছেন। আবার কেউ শেষ সম্বলটুকু বাঁচাতে নদীর পাড়ে বসে নিরুপায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কোথাও কোথাও ভাঙনের শব্দে মাটি কেঁপে উঠছে। মুহূর্তের মধ্যেই কয়েক শতক জমি আর গাছপালা তলিয়ে যাচ্ছে নদীর পানিতে।
ভিটেমাটি হারানো মোঃ মোমিন (২০) চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, “বাবা-দাদার ভিটা ছিল এখানে। জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে ঘর তুলেছিলাম। কয়েক দিনের মধ্যে সব নদীতে চলে গেল। এখন অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে আছি। ভাই বোনরা বারবার জিজ্ঞেস করে, এখন আমরা কোথায় থাকব? তাদের কোনো উত্তর দিতে পারি না।”
রফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন, “ঘর ভাঙার সময় স্ত্রী আর সন্তানদের কান্না দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেল। এখন খাবারের চিন্তা, থাকার চিন্তা—সব মিলিয়ে বড় কষ্টে আছি।”
কোহিনুর খাতুন (৪০) বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। যা ছিল সব নদী নিয়ে গেছে। এখন যদি সরকার সাহায্য না করে, তাহলে পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হবে।”
রেজাউল করিম (৪৮) বলেন, “নদী শুধু ঘরবাড়ি নেয়নি, আমাদের স্বপ্নও কেড়ে নিয়েছে। এখন মনে হচ্ছে আমরা যেন নিজের দেশেই উদ্বাস্তু হয়ে গেছি।”
জহুরুল ইসলাম (৫৫) বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষদের কবর ও মসজিদ ছিল এই চরে। সেই কবরস্থান ও মসজিদ নদীতে চলে গেছে। নিজের মানুষদের কবর হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”
চরগিরিশ চরের বৃদ্ধ রশিদ মিয়া নদীর দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বললেন, “জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। কিন্তু এমন অসহায় কখনো লাগেনি। সব হারিয়ে আমরা এখন কোথায় যাব?” যমুনার উত্তাল স্রোতের কাছে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। উত্তর খুঁজে ফিরছে ভেটুয়া ও চরগিরিশ চরের শত শত মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, ভাঙনের তীব্রতায় গ্রামের মসজিদ ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ইতিমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। শেষ মুহূর্তে এলাকার একটি মসজিদ ভেঙে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাজার। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকায় ফাটল দেখা দিচ্ছে। আতঙ্কে অনেকে আগেভাগেই ঘর খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন।
এদিকে যমুনার ঢেউ আছড়ে পড়ছে ভাঙনকবলিত তীরে। নদীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন চরবাসী। তাদের চোখে-মুখে অনিশ্চয়তার ছাপ। কেউ জানেন না, আগামীকাল ভোরে ঘুম থেকে উঠে নিজের বসতভিটা খুঁজে পাবেন কি না।
ওই ওয়ার্ডের সদস্য আল আমিন সরকার বলেন, “একসময় এই চরে প্রায় ৫০০/৬০০ পরিবারের বসবাস ছিল। নদী ভাঙনের কারণে দেড়শ পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। গত সাত দিনে আরও ৩০টি পরিবার গৃহহীন হয়েছে। যেভাবে ভাঙন এগোচ্ছে, তাতে আরও প্রায় ১০০ পরিবার যেকোনো সময় ভিটেমাটি হারাতে পারে।”
চরগিরিশ ইউনিয়ন বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট সমাজসেবক আলহাজ্ব শহিদুল ইসলাম বলেন, ভেটুয়া ও চরগিরিশ চরের যমুনার ভাঙনের বিষয়ে এমপি, ইউএনও এবং পিআইও মহোদয়কে অবহিত করা হয়েছে।
‘যমুনা উপজেলা চাই’ বাস্তবায়ন কমিটির অন্যতম সদস্য প্রকৌশলী ফরিদুল ইসলাম বলেন, চরগিরিশ ও ভেটুয়া চরের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ভাঙন অব্যাহত থাকলে পুরো চরটিই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসের মতো দেশে নদীভাঙনের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে নদীভাঙনের শিকার মানুষ ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, সরকার থেকে খোঁজখবর নেয়া হয় না।”
তিনি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক ক্ষতিপূরণ, খাদ্য সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নদীভাঙনকবলিত মানুষের জন্য একটি স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান।