মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক পথে ফেরার জন্য ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়েছেন বিশ্ব নেতারা। হরমুজ প্রণালীতে একাধিক হামলার পর যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার মুখে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালীতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি হামলার পর, নতুন করে আলোচনা শুরু করার তৎপরতা দেখা গেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির প্রায় এক মাস পর প্রথমবারের মতো তারা ইরানের হামলার মুখে পড়েছে।
তেহরান থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়। যুদ্ধবিরতির পর থেকেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা চলছে। পাকিস্তানে বৈঠকে অংশ নিতে দুইবার পরিকল্পনা বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইরান স্পষ্ট করেছে যে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ তারা ছাড়বে না। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলার আগে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যেত।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎস তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অঞ্চল ও বিশ্বকে জিম্মি করা বন্ধ করতে হবে।’ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমারও একই আহ্বান জানান।
মার্কিন ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবও উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। দেশটি বলেছে, রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তাদের বাহিনী ইরানের অন্তত ছয়টি ছোট নৌযান ডুবিয়ে দিয়েছে। তবে ইরান এ দাবি অস্বীকার করে। তারা অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র নৌকায় থাকা পাঁচ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে।
দেশটি একে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য আগ্রাসন’ বলে উল্লেখ করেছে।
ফুজাইরাহ আমিরাতের একটি জ্বালানি স্থাপনায় হামলায় তিন জন ভারতীয় নাগরিক আহত হয়েছেন।
চারটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়, যার তিনটি ভূপাতিত করা হয়েছে ও একটি সাগরে পড়ে। এছাড়া ইরান রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি অ্যাডনকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ট্যাংকারে ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি সামরিক কর্মকর্তা বলেন, সংশ্লিষ্ট তেল স্থাপনায় হামলার কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ‘দুঃসাহসিকতা’ থেকেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রণালী দিয়ে অবৈধভাবে জাহাজ চলাচলের পথ তৈরি করতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে জবাবদিহি করতে হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, এই সংঘর্ষ প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সংকটের সামরিক সমাধান নেই। তিনি পাকিস্তানের মধ্যস্থতার কথাও উল্লেখ করেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘অশুভকামীদের ফাঁদে পড়ে, যুক্তরাষ্ট্র যেন আবার জটিলতায় না জড়ায়। ইউএইকেও সতর্ক থাকতে হবে। প্রজেক্ট ফ্রিডম আসলে প্রজেক্ট ডেডলক।’
-হরমুজে শক্তি প্রদর্শন যুক্তরাষ্ট্রের-
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার ইরানকে প্রণালী খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
যুদ্ধের আগে এটি চালু ছিল। ইরান এটিকে তাদের কৌশলগত চাপের মূল হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। রোববার ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি উদ্যোগ ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, নিরপেক্ষ দেশের জাহাজগুলোকে উপসাগর থেকে বের করে আনার এটি একটি মানবিক প্রচেষ্টা।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে। প্রকল্পের অংশ হিসেবে দুটি মার্কিন পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজকে উপসাগর থেকে বের হয়েছে।
তবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড এ দাবি অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, গত কয়েক ঘণ্টায় কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেল ট্যাংকার প্রণালী অতিক্রম করেনি।
সিউল জানিয়েছে, প্রণালীতে একটি দক্ষিণ কোরীয় জাহাজে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সমুদ্র বিষয়ক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান এএক্সএসমেরিনের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত উপসাগরে ৯০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ অবস্থান করছিল।
ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ইরান ‘কিছু হামলা’ চালালেও বড় ধরণের ক্ষতি হয়নি।
হামলার পর তেলের দাম আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের জুলাই ডেলিভারির দাম পাঁচ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে, এটি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
লেবাননে ইসরাইলের সঙ্গে আলাদা যুদ্ধবিরতিও নতুন করে চাপে পড়েছে।
ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে ঘিরে এই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে ইসরাইলের দুই সেনা ‘মাঝারি মাত্রায়’ আহত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
মার্চের শুরুতে হিজবুল্লাহর আকাশ পথে হামলার পর ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক বোমাবর্ষণ ও স্থল অভিযান চালায়।
এতে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন বলে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন নিরাপত্তা চুক্তি ও ইসরাইলি হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
এর আগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকের প্রস্তাব দেন ট্রাম্প, যা এই মাসে হোয়াইট হাউসে হতে পারে।