লেবানন ও ইসরাইলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছে লেবাননে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস।
এর মধ্যেই লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি চলাকালেও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন।
চলতি মাসে ইসরাইল ও লেবাননের প্রতিনিধিরা ওয়াশিংটনে দু’দফা বৈঠক করেছেন। কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম এ ধরণের বৈঠক। গত ২ মার্চ ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ লেবাননকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে।
এর পরপরই ইসরাইল ব্যাপক হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে।
বৈরুত থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
প্রথম দফা আলোচনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৭ এপ্রিল থেকে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন। দ্বিতীয় দফা বৈঠকের পর তা আরও তিন সপ্তাহ বাড়ানো হয়।
ট্রাম্প বলেন, তিনি আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে একসঙ্গে আমন্ত্রণ জানাতে চান। দুই দেশ সরাসরি আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে এই আলোচনার সম্ভাব্য পরিকল্পনা লেবাননের ভেতরে বিভক্তি তৈরি করেছে। হিজবুল্লাহ সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে সংগঠনটিকে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে বৈরুতের আগের করা প্রতিশ্রুতি মানতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মার্কিন দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানায়, ‘লেবানন এখন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশটির জনগণের সামনে তাদের রাষ্ট্র পুনর্গঠন এবং সত্যিকারের সার্বভৌম ও স্বাধীন জাতি হিসেবে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। দ্বিধার সময় শেষ।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় আউন ও নেতানিয়াহুর সরাসরি বৈঠক হলে লেবানন পূর্ণ সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, নিরাপদ সীমান্ত, মানবিক ও পুনর্গঠন সহায়তা এবং দেশের প্রতিটি অংশে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা পেতে পারে। আর এগুলো যুক্তরাষ্ট্রই নিশ্চিত করবে।
-‘লঙ্ঘন’-
বুধবার আউন বলেন, আলোচনায় যাওয়ার আগে ইসরাইলকে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি মানতে হবে। এভাবে হামলা চলতে পারে না।
তিনি আরও জানান, ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার তারিখ নির্ধারণে তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের অপেক্ষায় আছেন।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও ইসরাইল লেবাননে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সেনারা সীমান্তবর্তী লেবাননের ভেতরে প্রায় ১০ কিলোমিটারের মধ্যে একটি ‘ইয়েলো লাইন’ বরাবর অভিযান চালাচ্ছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, বৃহস্পতিবার দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি হামলায় ১৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচ নারী ও দুই শিশু রয়েছে। এদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনীও জানায়, দক্ষিণ লেবাননে তাদের এক সেনা নিহত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার আউন দক্ষিণে ‘ইসরাইলের অব্যাহত লঙ্ঘনের’ নিন্দা জানান। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, হামলা থামছে না, বাড়িঘর ও উপাসনালয় ভাঙা হচ্ছে, হতাহতের সংখ্যা বাড়ছেই।
তিনি বলেন, ‘ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক আইন ও সনদ মেনে চলতে এবং বেসামরিক মানুষ, প্যারামেডিক, সিভিল ডিফেন্স ও মানবিক স্বাস্থ্য ও ত্রাণ সংস্থাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা বন্ধে চাপ দিতে হবে।’ এদিন ইসরাইলি হামলায় নিহত তিন সিভিল ডিফেন্স সদস্যকে দাফন করা হয়।
-‘আত্মসমর্পণ নয়’-
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ জানায়, বৃহস্পতিবার দক্ষিণ লেবাননে একাধিক বিমান হামলা হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র দক্ষিণের ২০টিরও বেশি গ্রামের বাসিন্দাদের সরে যেতে বলেছেন।
হিজবুল্লাহর দাবি, তারা লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনীর ট্যাংক ও সেনাসহ ১০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
বৈরুতে দক্ষিণ লেবাননের বাসিন্দা ও স্থানীয় কর্মকর্তারা ইসরাইলের চলমান ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিবাদে সমাবেশ করেছেন।
বিক্ষোভকারী হানা ইব্রাহিম (৪৮) বলেন, ‘আমরা আত্মসমর্পণ করব না। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকও করব না।’
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর প্রকাশিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘পরিকল্পিত, আসন্ন বা চলমান হামলার’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার ইসরাইলের রয়েছে।
হিজবুল্লাহ অবশ্য এ ধরনের ভাষা ও শব্দ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, এ প্রস্তাব কখনোই লেবাননের মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়নি। সেখানে তাদের প্রতিনিধি রয়েছে।
বুধবার আউন বলেন, এই ভাষা ২০২৪ সালের নভেম্বরে সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতেও ছিল এবং সেসময় ‘সব পক্ষ’ তাতে সম্মত হয়েছিল।
তবে পার্লামেন্ট স্পিকার ও হিজবুল্লাহ মিত্র নাবিহ বেরি আউনের বক্তব্যকে ‘কম করে বললেও ভুল’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, একই কথা ২০২৪ সালের নভেম্বরের চুক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।