বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ১০:২২ অপরাহ্ন

কাজিপুরে হারিয়ে যাচ্ছে এক সময়ের জনপ্রিয় খাদ্যশস্য ‘কাউন’

টি এম কামাল
  • আপডেট সময় : 4:26 pm, শনিবার, ৫ জুলাই, ২০২৫

সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে চরাঞ্চলে এক সময়ের পরিচিত ও পুষ্টিকর খাদ্যশস্য কাউন আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষিজীবী মানুষের খাবারের অংশ হয়ে থাকা এই শস্য এখন আর চরাঞ্চলের মাঠে আগের মতো দেখা যায় না। উপজেলার প্রত্যন্ত চরের কৃষকরা কাউন চাষ ছেড়ে ঝুঁকছেন বেশি লাভজনক ও উচ্চ ফলনের ফসলের দিকে।

কাজিপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে কাজিপুর উপজেলায় কাউনের চাষ নেমে এসেছে মাত্র ২০ হেক্টর জমিতে। অথচ গত বছরও ২২ হেক্টর জমিতে কাউন চাষ হয়েছিল। দুই দশক আগে অন্তত ৪০০ হেক্টর জমিতে এ শস্যের চাষ হতো। একসময় যে চরভূমিতে সোনালি কাউনের ঢেউ উঠত, সেখানে এখন চাষ হচ্ছে ধান, মরিচ, ভুট্টা, মিষ্টি কুমড়াসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক ফসল। কাউন বা ফক্সটেল মিলেট শুষ্ক সহনশীল ও কম খরচের একটি শস্য। বন্যা বা দুর্ভিক্ষের সময়গুলোতে চরবাসীর ভরসা ছিল এই কাউন। ধানের চেয়ে অনেক কম পানি ও সার লাগে বলে দরিদ্র কৃষকরা সহজে এটি চাষ করতেন এবং ভাতের বিকল্প খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতেন। তবে সময় বদলেছে। এখনকার কৃষকেরা ভাবেন লাভের কথা।

কাউনে লাভ নেই বলে জানান চরগিরিশের কৃষক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘গত বছর তিন বিঘায় চাষ করেছিলাম, এবার করেছি এক বিঘায়। প্রতি বিঘা থেকে চার থেকে ছয় মণ কাউন পাওয়া যায়। প্রতি মণ বিক্রি হয় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়; কিন্তু খরচ পড়ে আড়াই হাজার টাকা। হিসাব মেলে না।’ বাড়তি উৎপাদন খরচ, শ্রমিক সংকট আর ভোক্তার রুচির পরিবর্তনে কাউন আজ অতীতের স্মৃতি হওয়ার পথে। অনেকেই মনে করেন, এই শস্য আর যুগের সঙ্গে খাপ খায় না।

কাজিপুর উপজেলার চরাঞ্চলের মনসুর নগর ইউনিয়নের চরছিন্না গ্ৰামের কৃষক সোলায়মান হোসেন বলেন, ‘আগে বন্যার কারণে ধান হতো না, তখন কাউনই ছিল ভাত। এখন হাইব্রিড ধান করি, ভুট্টাও হয় ভালো। কেউ আর কাউন খায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘একসময় আমরা কাউনের ভাত খেতাম নিয়মিত, শরীরে শক্তিও পেতাম। এখন সেই স্বাদই ভুলে গেছি।’ মানুষ না খেলেও, এই শস্য এখন পাখির খাবার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। নাটুয়ারপাড়া হাটের ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষকের কাছ থেকে কাউন কিনে আমি ঢাকার পাখির বাজারে পাঠাই। এখন পাখিপ্রেমীরাই কাউনের বড় ক্রেতা।’ তার মতে, এক সময়ের নিত্যপ্রয়োজনীয় শস্য আজ সংস্কৃতি ও অর্থনীতির দিক থেকে পরিণত হয়েছে এক প্রান্তিক পণ্যে।

কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ ইউনিয়নের দ্বায়িত্ব প্রাপ্তি উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, বর্তমান ধারায় পরিবর্তন না এলে এক দশকের মধ্যেই চরাঞ্চল থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে কাউন। এটি শুধু ফসলচক্রের পরিবর্তন নয়, বরং একটি গ্রামীণ খাদ্য ঐতিহ্যের অবক্ষয়।

কাজিপুর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ শরিফুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে কাউনের মতো খরাসহনশীল ও কম খরচের ফসল অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সরকারি উদ্যোগ ও বাজার উৎসাহ না থাকলে চাষিরা এই ফসল টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী হবেন না। 

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই রকম আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2017 Cninews24.Com
Design & Development BY Hostitbd.Com