বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
১৭ বছরের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করেছে বিএনপি সরকার: এলজিআরডিমন্ত্রী ‘বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয়করণ দাবি বাস্তবায়িত হতে পারে’ সিরাজগঞ্জে কৃষকের মুখে হাসি আগাম শীতকালীন সবজি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে মেশিন তালাবদ্ধ ‘একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে’, মৃত্যুর চার দিন আগে বলেছিলেন নানা পাটেকার ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে পর্তুগালের উন্নতি, বাংলাদেশ-ব্রাজিলের অবনতি আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির যত অর্জন চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে নতুন কমিটি, মাফিয়াবৃত্তির অবসান ঘটবে : রিজভী শক্তিমান অভিনেতা নানা পাটেকার মারা গেছেন ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা চায় : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

ধাপে ধাপে কলঙ্ক ও দায় মোচন

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট সময় : 10:00 pm, বুধবার, ১১ মে, ২০১৬

ইতিহাসের সত্য কখনো মুছে ফেলা যায় না। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। ইতিহাস বিকৃত করা যায় এবং এ দেশে তা হয়েছেও কিন্তু ইতিহাসের অমোঘ সত্য একদিন না একদিন উদ্ভাসিত হবেই এটাই হলো চির সত্য কথা। এই সত্য বারবার আমাদের সামনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তা ভবিষ্যতেও হতেই থাকবে। আমরা জানি অপরাধ করে যদি কেউ পার পেয়ে যায় তবে এর বিরূপ প্রভাব সমাজে ক্ষত সৃষ্টি করেই চলে এবং বাংলাদেশে তাই হয়েছে। তবুও আশার কথা এই যে, ক্ষত উপশমের প্রক্রিয়া বিগত মহাজোট সরকারের শাসনামল থেকে শুরু হয়েছে। বর্তমান সরকার এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে। এ জন্য তাদের অভিনন্দন ও ধন্যবাদ। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায়  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মানবতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর আমির এবং বদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করেছিলেন ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর। তারপর নিজামী উচ্চআদালতে আপিল করে। আপিলের রায় ঘোষিত হলো ৬ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে। আপিলের রায়ে আগের দেয়া দণ্ড বহাল রাখেন মাননীয় বিচারকরা। তারপর নিজামী রিভিউ আবেদন করে এবং তা ৫ মে ২০১৬ তারিখ প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বেঞ্চে এই আবেদন খারিজ হয়ে যায়। একমাত্র প্রাণভিক্ষা চাওয়া ছাড়া এই রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে সব আইনি বাধার নিরসন ঘটল।
নিশ্চয়ই এ রায়ে আমরা খুশি। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে আমরা এই মানবতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অপেক্ষায় রয়েছি। বিগত মহাজোট সরকার বিলম্বে হলেও জাতির প্রত্যাশা পূরণে গণদাবির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এদের বিচার কার্যক্রম শুরু করে এবং নানা রকম প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে ইতোমধ্যে কয়েকজন মানবতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীর চূড়ান্ত বিচার সম্পন্নের পর রায়ের ভিত্তিতে দণ্ড কার্যকরও হয়েছে। আরো কয়েকটি মামলা রয়েছে চূড়ান্ত পর্বে। সচেতন মানুষমাত্রই এ ব্যাপারে বিশদভাবে জ্ঞাত। একাত্তরে বাঙালি জাতির ওপর যে পৈশাচিক বর্বরতা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চালিয়েছিল এর সহযোগী ছিল নিজামী গংরা। বিলম্বে হলেও তাদের বিচার হচ্ছে। আমরা সুবিচার পাচ্ছি। ইতোমধ্যে কয়েকজন মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড কার্যকর হওয়ায় আমরা দায়মুক্তির পথে অনেকটা এগিয়েছি। এমন প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ইতিহাসের দায়মুক্তির অব্যাহত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা চলেছি। যেহেতু আইনানুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে বড় কিংবা বেশি কোনো শাস্তি নেই তাই এই রায় যথার্থ হয়েছে এমনটিই আমরা মনে করি। কতিপয় স্বার্থান্বেষী, তথাকথিত গণতান্ত্রিক-অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ব্যক্তি ও মহলবিশেষের কারণে নিজামীরা এ দেশে রাজনীতি করার এবং জাতীয় সংসদে বসার সুযোগ পেয়েছে। তারা মন্ত্রী পর্যন্ত ধাপে ধাপে কলঙ্ক ও দায় মোচনহতে পেরেছিল। সেই অধ্যায়গুলো আমাদের বেদনাকে ক্রম পুষ্ট করেছিল। গ্লানি ও লজ্জার অধ্যায়কেও করেছিল বিস্তৃত। তবে আজ বলতে পারছি, আমরা ক্রমান্বয়ে গ্লানিমুক্ত হচ্ছি। আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত পথের সন্ধান পাচ্ছি। বিলম্বে হলেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার গণদাবির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে ইতিহাসের দায়মুক্তির লক্ষ্যে অবিচল থেকে এগিয়ে যাচ্ছে দৃঢ়চিত্তে। এ জন্য বিগত মহাজোট ও বর্তমান সরকারকে অভিনন্দন। যেসব প্রতিবন্ধকতা-প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে জাতির প্রত্যাশা ও দাবি পূরণে তারা অবিচল তা এও প্রমাণ করে যে, এটি হচ্ছে তাদের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি পূরণের সফল দৃষ্টান্ত।
স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জšে§র পেছনে যে আনন্দ-বেদনা-স্বজনহারানোর শোক-ধ্বংসযজ্ঞ এবং একই সঙ্গে বীরত্বগাথা রয়েছে এর সঙ্গে যুক্ত আছে রাজাকার, আলবদর, আলশামস ইত্যাদি বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত ঘৃণ্য মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের কলঙ্কও। বিগত ৪৫ বছর ধরে এ দেশের প্রগতিবাদী-শান্তিবাদী-মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির মানুষ এ দায় বহন করছিল। পুনর্বার বলি, যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধীদের বিচারের মধ্য দিয়ে আমরা দায় মোচনের পথে এগোচ্ছি। নিজামীর মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখার মধ্য দিয়ে আমরা আরেক ধাপ দায় মুক্তির পথে এগোলাম। যে বা যারা জাতির এই শত্রুদের, ঘাতকদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করে চরম ঘৃণ্য কাজ করেছেন তাদের বিচারও সময়ের দাবি। যারা এতদিন এই কুখ্যাতদের নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দিয়ে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লালন-পালন করেছেন তারা তো অচেনা কিংবা অচিহ্নিত নন। স্বাধীনতা অর্জনের ৪৫ বছর পর আজ মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়! শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কাণ্ডজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়! ভাবা যায় কী সীমাহীন ধৃষ্টতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ কাণ্ড এখনো চলছে রাজনীতির নামে অপরাজনীতির মাধ্যমে এ দেশে! মুক্তিযুদ্ধ, শহীদদের সংখ্যা, বুদ্ধিজীবীদের কাণ্ডজ্ঞান এসব বিষয়ে মন্তব্য করা মানে ভিন্নমত পোষণ করা নয়, চরম ধৃষ্টতা এবং ঔদ্ধত্য প্রদর্শন। সোজা কথায় এসব দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে এ দেশের কোন রাজনৈতিক দলের কী অবস্থান তাও সচেতন মানুষের অজানা নয়। যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রশ্নে ‘নিরপেক্ষ’ বলে কোনো পক্ষ থাকতে পারে না। যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধীদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হোক এটিই আমাদের মুখ্য দাবি এবং এ দাবির বিপক্ষে যারা তাদের অবস্থান এ দেশে কী তাও নতুন করে বলার কিছু নেই। এ প্রশ্নে যে বা যারা নিরপেক্ষতার ভান ধরেন, ধরেছেন কিংবা ধরতে চান সোজা কথায় তাদের অবস্থান জাতির শত্রুদের পক্ষে। বর্তমান প্রজš§ অর্থাৎ তরুণ প্রজš§কে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাতে হয়। তারা এ ব্যাপারে দৃঢ়ভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে। এই তরুণদের সিংহভাগ মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। কিন্তু তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে শানিত-সমৃদ্ধ হয়ে মানবতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে যেভাবে পথে নেমেছে তা আমাদের নতুন করে দিগন্তবিস্তৃত স্বপ্ন দেখায়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে বাংলাদেশ চেয়েছি এখন বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তা আরো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, সেই স্বপ্ন পূরণের নতুন পথ নির্মাণ করবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ তরুণ প্রজš§। তরুণদের অগ্রযাত্রার পথ ক্রম মসৃণ হোক।
আবারো সেই কথাই বলতে হচ্ছে প্রাসঙ্গিক কারণেই। গত মহাজোট সরকার মানবতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল বর্তমান সরকারও এক্ষেত্রে অটল-অবিচল রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা হাঁটছি কলঙ্ক মুক্তির পথে। সেই ধারাবাহিকতায়ই ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে আমরা এগোলাম আরো এক ধাপ। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী শক্তি এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর জঘন্য অপরাধের নৃশংসতা এখনো আমাদের সমাজে বর্তমান। সেই সহযোগী কিংবা সহায়ক শক্তির বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে এখনো তাদের সহযোগীরা তৎপর। এদের ব্যাপারে আমাদের অধিকতর সতর্ক থাকতেই হবে। প্রতিক্রিয়াশীল চক্র, জঙ্গি-উগ্রবাদী গোষ্ঠী, একাত্তরের পরাজিত শক্তি দেশকে যেন পেছনে ঠেলে দিতে না পারে, কোনো রকম অপকাণ্ড ঘটাতে না পারে এ ব্যাপারে আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে থাকতে হবে সজাগ-সতর্ক এবং সক্রিয়। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির আস্ফালন আজো কমেনি, ষড়যন্ত্র থামেনি। নিকট অতীতে মানবকণ্ঠের শীর্ষ প্রতিবেদনে এ রকম ষড়যন্ত্রের তথ্যচিত্র পুনর্বার ফুটে উঠেছে। এদের অপকাণ্ড আজো আমাদের সামাজিক শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে। তারা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে নানা রকম অপকাণ্ড চালানোর ধৃষ্টতা দেখাতে তৎপর। এদের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। গণহত্যা কিংবা যে কোনো ধরনের হত্যাকাণ্ড ও অপরাধের বিচারের দাবি কখনো তামাদি হয় না। অপশক্তির দুঃসাহস দেখানোর কোনো পথই খোলা রাখা যাবে না। নিজামীদের পরিচয় নতুন করে দেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি তারাও আজ এদের চেনে-জানে এবং রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয়ার হোতা এই কুখ্যাতদের বিচার দাবিতে খুব সঙ্গতই সোচ্চার। আমাদের আশা ও শক্তির বড় কিংবা পুষ্ট জায়গা এখানেই। এখন ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার বিচারের দাবিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি উচ্চকণ্ঠ। নিঃসন্দেহে এও সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দাবি। এই দাবির পক্ষে সব রকম প্রচেষ্টা জোরদার করা খুব জরুরি।
আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে যারা অতীতে রাজপথে নেমেছে কিংবা এখনো নামছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এমন ধৃষ্টতা প্রদর্শন নিশ্চয়ই অপরাধ। দেশের মানুষ যুদ্ধাপরাধ-মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে যে রায় পাচ্ছে এসবই আমাদের কাক্সিক্ষত বাংলাদেশের জন্য বড় বেশি সহায়ক। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথেও বড় দৃষ্টান্ত। অপরাধ করে কেউই পার পেতে পারে না এই দৃষ্টান্ত আমাদের সমাজে যত পুষ্ট হবে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তত দ্রুত বাস্তবায়িত করা সম্ভব হবে। অপরাধী যদি অপরাধ করে পার পেয়ে যায়, তাকে যদি বিচারের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব না হয় তাহলে সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। আইনের শাসন নিশ্চিত করার জন্যই দ্রুত বিচার প্রয়োজন এবং বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর হওয়াটাও জরুরি। এক্ষেত্রে আমাদের সামনে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত ক্রম পুষ্ট হচ্ছে এটিই হলো স্বস্তির বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই রকম আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2017 Cninews24.Com
Design & Development BY Hostitbd.Com