বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৮ পূর্বাহ্ন

জোয়ারের সঙ্গে শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই করে টিকে থাকে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট সময় : 6:00 pm, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীকে দিনে দুবার নিয়ম করে ধেয়ে আসা জোয়ারের নোনা পানির সঙ্গে লড়াই করেই টিকে থাকতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং একের পর এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের কারণে এই প্রাণীদের, বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব এখন চরম সংকটে। জোয়ারের পানির অস্বাভাবিক উচ্চতা এবং বনের স্থলভাগ ক্রমে সংকুচিত হতে থাকায় বনের জীববৈচিত্র্যকে প্রতিদিন বেঁচে থাকার এক অসম সংগ্রামে নামতে হচ্ছে।

স্রোতের প্রথম ধাক্কা

জোয়ারের পানি যখন তীব্র বেগে বনের ভেতরের সরু খাল ও খাঁড়ি দিয়ে ঢুকতে শুরু করে, তখন বনের শান্ত পরিবেশ নিমেষেই অশান্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষায় ‘প্রথম পালি’র ধাক্কায় সবচেয়ে বিপদে পড়ে চিত্রা হরিণের সদ্যজাত ছানা ও বন্যশূকরের দল। বড় প্রাণীদের মতো সাঁতরে নিজেদের ধরে রাখার সামর্থ্য তাদের নেই। তীব্র স্রোত তাদের ভাসিয়ে নেয় মূল নদীতে, যেখানে ওত পেতে থাকে ক্ষুধার্ত নোনা পানির কুমির।

দিনের চেয়ে অমাবস্যা-পূর্ণিমার রাতে জোয়ারের রূপ আরও মারাত্মক। বনের বানর, তক্ষক বা বুনো পাখি যখন অন্ধকারে গাছের ডালে ঘুমিয়ে থাকে, তখন হুড়মুড় করে পানি চলে আসে। রাতের অন্ধকারে পানির গভীরতা ও স্রোতের তীব্রতা আন্দাজ করতে না পেরে অনেক সময় বন্যপ্রাণী ও পাখির বাসা পানির নিচে চলে যায়। রাতে উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়ার লড়াই তাই দিনের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক।

বাঘের জলযুদ্ধ ও হরিণের জীবনবাজি

জোয়ারের সময় সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার দক্ষ সাঁতারু হয়ে ওঠে। জোয়ারের স্রোতের বিপরীতে মাইলের পর মাইল সাঁতরে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে যাতায়াত সুন্দরবনের বাঘের নিত্যদিনের রুটিন। গবেষকেরা বনের গাছে গাছে ক্যামেরা ট্র্যাপসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখেছেন, জোয়ারের সময় বাঘ কীভাবে স্রোতের বিপরীতে সাঁতরায় এবং হরিণ কীভাবে দলবদ্ধভাবে উঁচু স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে।

পানি বাড়তে শুরু করলেই চিত্রা হরিণ ও বন্যশূকরের দল বনের তুলনামূলক উঁচু জায়গা বা কৃত্রিম মাটির ঢিবির দিকে ছুটতে থাকে। এসব ঢিবি ‘কেল্লা’ নামে পরিচিত। সাধারণ জোয়ারে প্রাণীদের তেমন সমস্যা না হলেও অমাবস্যা-পূর্ণিমার ‘জো’ কিংবা বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপের কারণে যখন স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ ফুট উঁচুতে পানি আছড়ে পড়ে, তখন পুরো সুন্দরবন ডুবে যায়। তখন হরিণ, বন্যশূকর ও বাঘের প্রধান ভরসা এই কেল্লা। পানি বাড়লে শত শত হরিণ ও বন্যপ্রাণী কেল্লায় গাদাগাদি করে আশ্রয় নেয়। তবে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি প্রাণী চলে আসায় এবং খাবারের অভাবে সেখানেও শুরু হয় বেঁচে থাকার নীরব লড়াই।

টেরিটরি দখলের যুদ্ধ ও শত্রুর সঙ্গে সহাবস্থান

সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের নিজেদের মধ্যে টিকে থাকার লড়াইও নির্মম। প্রতিটি বাঘ প্রস্রাব ও গাছের ছাল আঁচড়ে নিজের একটি নির্দিষ্ট টেরিটরি বা এলাকা চিহ্নিত করে রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাঘের এই এলাকা সংকুচিত হয়ে পড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে এক বাঘের এলাকায় অন্য বাঘ ঢুকে পড়ায় প্রায়ই রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়। এই ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে অনেক সময় প্রবীণ বা দুর্বল বাঘ মারা যায় অথবা এলাকাছাড়া হয়ে লোকালয়ের কাছে চলে আসে।

এদিকে জোয়ারের পানি যখন বনের মাটি ছাড়িয়ে গাছের কাণ্ড ছুঁয়ে ফেলে, তখন মাটির গর্তে থাকা বিষধর সাপ, যেমন কিং কোবরা, বাঁচার জন্য গাছের মগডালে আশ্রয় নেয়। একই গাছে হয়তো আশ্রয় নিয়েছে কোনো বানর বা পাখি। জীবনের এমন চরম সংকটে শিকার ও শিকারিকে একই গাছের ডালে পাশাপাশি বসে পানি নেমে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়।

জোয়ারের পর মিঠা পানির হাহাকার

জোয়ারের পানি নেমে যাওয়ার পর বন্যপ্রাণীর সবচেয়ে বড় লড়াই শুরু হয় মিঠা পানির খোঁজে। সুন্দরবনের নদী-খালের পানি প্রচণ্ড নোনা। প্রাণীদের তৃষ্ণা মেটানোর একমাত্র উপায় বনের ভেতরের প্রাকৃতিক বা মানুষের খনন করা কিছু মিঠা পানির পুকুর। কিন্তু বড় জোয়ার বা জলোচ্ছ্বাসের সময় নোনা পানি ঢুকে পুকুরগুলো নোনা হয়ে যায়। ফলে তৃষ্ণায় ছটফট করলেও প্রাণীরা পানি পান করতে পারে না। বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তীব্র তৃষ্ণা নিয়েই তাদের ধুঁকে ধুঁকে বাঁচতে হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত এই সংকটের পাশাপাশি স্থানীয় কাঠুরে ও গোলপাতা সংগ্রহকারী, যারা বাওয়ালি নামে পরিচিত এবং জেলেরা যখন অতিরিক্ত মাত্রায় বনের ভেতরের খালের গভীরে বিচরণ করেন, তখন প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটে। ভয় পেয়ে হরিণ বা বাঘ এমন এলাকায় চলে যায়, যেখানে জোয়ারের পানির গভীরতা বেশি। এতে তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।

গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য

সুন্দরবনের এই রূঢ় জীবনযুদ্ধ কোনো কাল্পনিক গল্প নয়। দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের জরিপে এর বাস্তব চিত্র বারবার উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণায় (শারীফ এ মুকুল ও সহযোগীরা, ২০১৯) বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বর্তমান ধারা চলতে থাকলে ২০৭০ সালের মধ্যে সুন্দরবনে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের বসবাসের উপযোগী কোনো স্থান অবশিষ্ট থাকবে না।

এর আগে ২০১০ সালে ডব্লিউডব্লিউএফের নেতৃত্বে কোলবি লাউকস ও সহযোগীদের গবেষণায় (ক্লাইমেটিক চেঞ্জ জার্নাল) হিসাব করা হয়, ২০০০ সালের তুলনায় সমুদ্রপৃষ্ঠ ২৮ সেন্টিমিটার বাড়লে সুন্দরবনে বাঘের অবশিষ্ট আবাসস্থল ৯৬ শতাংশ কমে যাবে এবং প্রজননক্ষম বাঘের সংখ্যা ২০টির নিচে নেমে আসবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ বিশেষজ্ঞ ড. মো. আবদুল আজিজের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের বাঘের খাদ্যের জৈবভরের প্রায় ৭৮ শতাংশ জোগান দেয় চিত্রা হরিণ। যেসব অঞ্চলে চিত্রা হরিণের ঘনত্ব বেশি, সেসব অঞ্চলেই বাঘের ঘনত্বও সবচেয়ে বেশি। গবেষকদের মতে, শিকার, আবাসস্থল হ্রাস বা পরিবেশগত কারণে হরিণের সংখ্যা কমলে বাঘের টিকে থাকা সরাসরি ঝুঁকিতে পড়বে।

সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রিমালের সময় সুন্দরবন প্রায় ৩৬ ঘণ্টা জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসের পানির নিচে ছিল। জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ৮ থেকে ১২ ফুট বলে জানিয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে বন বিভাগ ৯৬টি মৃত হরিণ উদ্ধার করে। অন্য একটি প্রতিবেদনে সাত দিনে ১৩৪টি হরিণ উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে।

একই জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের ভেতরের ৮০টি মিঠা পানির পুকুর নোনা পানিতে প্লাবিত হয়। এতে বন্যপ্রাণী ও বনকর্মীরা সুপেয় পানির তীব্র সংকটে পড়েন।

সুন্দরবনের পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা মারাত্মকভাবে বাড়ায় প্রধান গাছ সুন্দরী পুষ্টিহীনতা ও শীর্ষমরা রোগে আক্রান্ত হয়ে ক্রমে কমে যাচ্ছে। এতে হরিণের প্রধান খাদ্য উপাদান কমছে, যা বাঘের খাদ্যশৃঙ্খলকেও চরম সংকটে ফেলছে।

সংকট উত্তরণে করণীয়

সুন্দরবনের বিপন্ন জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বন্যপ্রাণীকে জোয়ার ও নোনা পানির আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে কিছু বাস্তবমুখী ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বনের ভেতরে তৈরি কৃত্রিম মাটির ঢিবি বা কেল্লার উচ্চতা বাড়াতে হবে, যাতে অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাসেও সেগুলো ডুবে না যায়। কেল্লার চারপাশে লবণসহিষ্ণু এবং হরিণের খাদ্য উপযোগী ঘাস ও গাছের চারা লাগাতে হবে। বনের গভীর অংশে নতুন কেল্লাও নির্মাণ করতে হবে।

বন্যপ্রাণীকে বাঁচানোর সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি সুপেয় মিঠা পানির জোগান ধরে রাখা। পুকুরগুলোর পাড় আরও উঁচু ও টেকসই করতে হবে, যাতে জলোচ্ছ্বাসের নোনা পানি ঢুকতে না পারে। পুকুরের মুখে আধুনিক স্লুইস গেট বসানো যেতে পারে, যা জোয়ারের সময় বন্ধ থাকবে এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে সাহায্য করবে।

হরিণ ও বাঘের চোরাশিকার নির্মূলে বন বিভাগের টহল আরও জোরদার করতে হবে। দুর্গম ও সংবেদনশীল এলাকায় ক্যামেরা ট্র্যাপের পাশাপাশি ড্রোনের সাহায্যে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো দরকার, যাতে চোরাশিকারিরা ফাঁদ পাততে না পারে।

জলোচ্ছ্বাসে মিঠা পানির পুকুর নোনা হলে প্রাণীরা পানি ও আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে চলে আসে এবং মানুষের হাতে মারা পড়ে। এটি ঠেকাতে বনের সংবেদনশীল সীমানায় শক্তিশালী নাইলনের বেড়া দেওয়া প্রয়োজন, যা প্রাণীদের লোকালয়ে প্রবেশে বাধা দেবে এবং বাঘ-মানুষের দ্বন্দ্ব কমাবে।

কোর জোন বা বন্যপ্রাণীর প্রধান প্রজনন এলাকায় মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। পর্যটনও এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে লঞ্চ বা স্পিডবোটের শব্দে ভয় পেয়ে বাঘ বা হরিণ গভীর পানিতে ঝাঁপ না দেয়।

বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো ভূমিকা রেখে যেতে হবে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সামান্য হলেও দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

ভাষণে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়াতে এবং বড় জলাধারের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণে সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে।

সুন্দরবন-সংলগ্ন নদীগুলোরও পলি অপসারণ বা ড্রেজিং প্রয়োজন, যাতে নদীর পানি ধারণক্ষমতা বাড়ে এবং জোয়ারের পানি বনে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি করতে না পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই রকম আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2017 Cninews24.Com
Design & Development BY Hostitbd.Com