
দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-হাবিপ্রবি’র ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম উদ্ভাবন করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক একটি প্রযুক্তি। তার উদ্ভাবিত এআই প্রদ্ধতি মাটি ও আবহাওয়ার বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে জমির জন্য উপযোগী ফসলের পরামর্শ দিতে পারে।
গতকাল শুক্রবার দিনাজপুর হাবিপ্রবি জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. খাদেমুল ইসলাম এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য বাসস’কে নিশ্চিত করেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গবেষণায় মাটির পিএইচ নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২৮ ধরনের ফসলের মধ্য থেকে উপযোগী ফসল নির্বাচন করতে পারে এই এআই পদ্ধতি। পাশাপাশি বাংলায় কৃষকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম এআই চ্যাটবট।
এই পদ্ধতির গবেষক হাবিপ্রবি’র শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম বাসস’কে জানান, সম্প্রতি দিনাজপুরের বিএডিসি নার্সারি মাঠে প্রযুক্তিটির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হয়েছে। পরীক্ষায় এআই মডেলটি ৯৭ শতাংশের বেশি সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। কৃষিতে প্রযুক্তির এমন ব্যবহার হাবিপ্রবি’র শিক্ষার্থী তরুণদের উদ্ভাবনী সক্ষমতার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
হাবিপ্রবি’র ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২৩ ব্যাচের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম। সে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে সংগ্রহ করা ২৮ ধরনের ফসলের মাটির বাস্তব ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধি মত্তা, এআই নির্ভর একটি ফসল সুপারিশ ব্যবস্থা। মেশিন লার্নিং পাইপলাইন, নিজস্ব লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেল চ্যাটবট এবং অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্রযুক্তি মাটির পিএইচ, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের তথ্য বিশ্লেষণ করে, কৃষককে সবচেয়ে উপযোগী ফসলের পরামর্শ দেয়। পাশাপাশি বাংলায় কৃষকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম এই এআই-ভিত্তিক চ্যাটবট।
সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন-বিএডিসি’র দিনাজপুর নার্সারি মাঠে সফল পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পর প্রযুক্তিটি এখন পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
সূত্র জানায়, গবেষণার গল্পটা শুরু হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে। অধিকাংশ গবেষণায় যেখানে প্রস্তুত ডেটাসেট ব্যবহার করা হয়, সেখানে নাহিদ ইসলাম ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি নিজেই হাবিপ্রবি ক্যাম্পাস এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করেন। ২৮ ধরনের ফসলের জন্য আলাদাভাবে মাটির বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করেন। সেই বাস্তব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেন সম্পূর্ণ মেশিন লার্নিং অ্যান্ড্রয়েড।
মাটি বিশ্লেষণের জন্য তিনি পিএইএইচ, নাইট্রোজেন (ঘ), ফসফরাস (চ), পটাশিয়াম (ক), আর্দ্রতা, তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর ডেটা প্রি-প্রসেসিং, ফিচার ইঞ্জিনিয়ারিং, মডেল ট্রেনিং ও ভ্যালিডেশনের মাধ্যমে তৈরি করেন একটি এআই মডেল, যা টেস্ট ডেটাসেটে ৯৭ শতাংশের বেশি সফলতা অর্জন করেছে।
তবে এই গবেষণা কেবল একটি এআই মডেল তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তবে কৃষকের হাতে সহজে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে তিনি পুরো প্রযুক্তিটিকে ৪টি স্তরে সাজিয়েছেন।
প্রথম স্তরে রয়েছে এলওটি-ভিত্তিক মাটির বিশ্লেষেণ। মাঠেই এই ডিভাইস মাটির পিএইচ, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা পরিমাপ করে সরাসরি ক্লাউডে পাঠায়। ফলে ল্যাবে নমুনা নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না এবং অল্প সময়েই মাটির অবস্থা জানা যায়।
দ্বিতীয় স্তরে কাজ করে ক্রপ রেকমেন্ডশন ইঞ্জিন। ক্যাম্পাস থেকে সংগ্রহ করা বাস্তব ডেটায় প্রশিক্ষিত মেশিন লার্নিং মডেল জমির বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে ২৮টি সম্ভাব্য ফসলের মধ্য থেকে সবচেয়ে উপযোগী ফসল নির্বাচন করে দেয়। পরীক্ষায় এই মডেলের নির্ভুলতা ৯৭ শতাংশের বেশি।
তৃতীয় স্তরে রয়েছে গবেষকের নিজস্ব তৈরি এলএলএম চ্যাটবট। কৃষক বাংলায় প্রশ্ন করলেই এটি তাৎক্ষণিক উত্তর দিতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চ্যাটবট পরিচালনার জন্য কোন তৃতীয় পক্ষের ব্যয়বহুল এআই-এপিআই’র ওপর নির্ভর করতে হয় না। ফলে প্রযুক্তিটি আরো সাশ্রয়ী ও দেশীয় সমাধান হিসেবে গড়ে উঠেছে।
সবশেষে রয়েছে একটি অ্যান্ড্রয়েড এপিকে, যা সাধারণ স্মার্ট-ফোনেই ব্যবহার করা যায়। বিশেষ কোন হার্ডওয়্যার ছাড়াই কৃষক প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে মুহূর্তেই ফসলের সুপারিশ পেতে পারেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের কাছে,স্বল্প খরচে এই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়াই এর মূল লক্ষ্য।
ল্যাবে তৈরি প্রযুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর, সেটি যাচাই করতেই সম্প্রতি দিনাজপুরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের নার্সারি মাঠে পরিচালিত হয় মাঠ পরীক্ষা। সেখানে গবেষক নাহিদ ইসলাম নিজেই এলওটি-ভিত্তিক মাটির বিশ্লেষণ ডিভাইস স্থাপন করে সঠিক সময়ে মাটির তথ্য সংগ্রহ করেন এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে এআই কিভাবে তাৎক্ষণিকভাবে ফসল নির্বাচন করে, পুরো প্রক্রিয়াটি প্রদর্শন করেন।
সূত্র জানায়, এই গবেষণার একাডেমিক তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন হাবিপ্রবি ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. দুলাল হাসান। মাঠপর্যায়ে গবেষণাটির বাস্তবায়নে সহায়তা করেন বিএডিসি দিনাজপুর কৃষিবিদ শাহানা পারভীন।
এ বিষয়ে গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক দুলাল হাসান বলেন, ‘নাহিদ শুধু একটি মডেল তৈরি করেনি, সে ক্যাম্পাস থেকে নিজে ডেটা সংগ্রহ করে পুরো পাইপ-লাইন দাঁড় করিয়েছে। একজন শিক্ষক হিসেবে এটা দেখে সত্যিই গর্ব হয়। এই সিস্টেমটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কৃষকদের জন্য বাস্তবসম্মত একটি সমাধান।’