
পতিত আওয়ামী লীগ থেকে আসা সুবিধাভোগীদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন বিএনপির দীর্ঘ ১৭ বছরের রক্তঘাম ঝরানো ত্যাগী ও বঞ্চিত নেতাকর্মীরা। ক্ষমতার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় দলটির নাম ব্যবহার করে একশ্রেণির অনুপ্রবেশকারী ও ‘হাইব্রিড’ নেতাকর্মী চাঁদাবাজি, দখলদারি, লুটপাট এবং মব তৈরির মতো নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে—যার দায়ভার গিয়ে পড়ছে বিএনপির কাঁধে। এমন পরিস্থিতিতে দলে অনুপ্রবেশকারীদের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সম্প্রতি বরিশালে অনুষ্ঠিত এক বিভাগীয় সাংগঠনিক সভায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে সরকারপ্রধান বলেন, “১৭ বছর ধরে ভয়াবহ নির্যাতন, গুম, খুন এবং হাজার হাজার রাজনৈতিক মামলার ঝড় উপেক্ষা করেও তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরাই দলকে টিকিয়ে রেখেছেন। সেই ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করেই দলকে সামনে এগিয়ে নেওয়া হবে। কোনো অবস্থাতেই দলে হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশকারীদের ঠাঁই দেওয়া যাবে না।”
দলের হাইকমান্ড ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের পর সব সময় এক ধরনের ফায়দা লুটতে চাওয়া ‘বর্ণচোরা’ শ্রেণির উত্থান ঘটে। তারা ক্ষমতার কাছাকাছি ভিড়তে মরিয়া হয়ে ওঠে, যার ফলে দলের আসল প্রাণ ত্যাগী নেতারা আড়ালে চলে যান। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে তারেক রহমান আগেই এ বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
বরিশালের সভায় উপস্থিত থাকা বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, “প্রভাবশালী হাইব্রিডরা দলটির সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। গত ১৭ বছর যাদের দেখা মেলেনি, তারা হঠাৎ নেতা বনে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, আমাদের তা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।”
একই বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “অনুপ্রবেশকারীরা দলের চেয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকে। ত্যাগীদের মর্যাদা রক্ষা না হলে তারা হতাশ হয়ে পড়েন। জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে হাইব্রিড ঠেকানো ছাড়া বিকল্প নেই।”
প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী বার্তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মনে করেন, নির্বাচনের পর এমন সুবিধাবাদীদের ভিড় বাড়া নতুন কিছু নয়। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত এই নির্দেশনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, “অনুপ্রবেশকারীরা ক্ষমতার কাঠামোতে ঢুকে পড়লে ত্যাগী কর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যান, যা একটি দলের অস্তিত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তারেক রহমানের এই আগাম সতর্কবার্তা দলের ত্যাগী অ্যাম্বাসেডরদের মূল্যায়ন করতে সাহায্য করবে।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ও নির্বাচন ঘনিয়ে আসার মুখে গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, কুমিল্লা, গাজীপুর, নীলফামারী, পটুয়াখালী ও বরিশালসহ বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অর্ধলক্ষাধিক নেতাকর্মী কৌশল বদলে বিএনপিতে ভিড়েছেন বা আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক অনুষ্ঠানে নতুন করে দলে না নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে কিছু নেতার আশ্রয়ে যোগদানের এ হিড়িক চলায় সাধারণ নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।