মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১১:৪৪ অপরাহ্ন

শত শত মানুষের চোখে আলো ফেরানোর মানবিক এক নীরব মানুষ বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল বাসার খান

জাকির হোসেন পাটোয়ারী রাজবাড়ী প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : 10:43 am, মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬
উঠোনের এক কোণে বসে চালের খুদ কুড়োচ্ছিলেন আলেয়া বেগম (৬৫)। হঠাৎই হাত থেমে যায়। চোখ ছোট করে সামনে তাকান, তারপর মৃদু হেসে বলেন, এখন সব পরিষ্কার দেখি। কয়েক মাস আগেও তার পৃথিবী ছিল ঝাপসা, রান্নাঘরের আগুন, উঠোনের পথ, এমনকি নাতি-নাতনিদের মুখও ঠিকমতো চিনতে পারতেন না তিনি।
সেই অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার গল্পের পেছনে আছেন রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার এক নীরব মানুষ বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল বাসার খান।
২০১৫ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন ছড়িয়ে পড়েছে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও আশপাশের কয়েকটি জেলায়। মধুখালীর মালেকা চক্ষু হাসপাতাল থেকে তিনি ছানি ও নেত্রনালী অপারেশনের ব্যবস্থা করেন তিনি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল বাসারের ভাষ্য, সঠিক হিসেব নেই তবে ৪শতাধিক হবে। দশক পেরিয়ে গেছে, প্রায়ই তো এ ধরণের সমস্যা নিয়ে দরিদ্র মানুষ আসে বাড়ীতে।
শুরুটা যেভাবে হয়েছিল:
মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল বাসার বলেন, আমার স্ত্রীর চোখের নেত্রনালীর সমস্যার কারণে ২০১৫ সালের শুরুর দিকে মালেকা চক্ষু হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে এমন একটি দৃশ্য দেখি, যা আমার জীবনটাই বদলে দেয়। দুইজন দরিদ্র মানুষ অপারেশনের খরচ জোগাড় করতে না পেরে কান্না করছিলেন। তাদের সেই অসহায় কান্না আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়।
তিনি বলেন, তখনই মনে হয়েছিল আমি কি তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি না? শুধু ওই দুজন নয়, এমন শত শত মানুষ আছে, যারা টাকার অভাবে এই সুন্দর পৃথিবী দেখতে পারছে না। সেই ভাবনা থেকেই শুরু করি ছানি-নেত্রনালী অপারেশনে সহযোগিতা।
এই উদ্যোগে পরিবারের সদস্যরাও তার শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। খায়রুল বাসার জানান, এই কাজের সিংহভাগ অর্থ জোগান দেয় আমার মেয়ের জামাই শামিম আহমেদ, সে চাকরি করে। আমার ছেলেও যথেষ্ট সহযোগিতা করে। তাদের সহায়তা না থাকলে এতদূর আসা সম্ভব হতো না।
মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল বাসার খান এর বাড়ী রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার খোর্দ্দমেগচামী গ্রামে। তিনি এক ছেলে, এক মেয়ের জনক। স্ত্রী নিয়ে গ্রামের বাড়ীতেই থাকেন তিনি। আনসার ও ভিডিপি থেকে অবসর নেয়ার পর যুক্ত হয়েছেন কৃষি কাজে। ভিডিপি সেবার জন্য তিনি পেয়েছিলেন রাষ্ট্রপ্রতি পদক।
খায়রুল বাসার জানান, সাধারণভাবে একজন রোগীর ছানি অপারেশনে প্রায় ৮ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে মানবিক দৃষ্টিকোণ বিবেচনায় মালেকা চক্ষু হাসপাতাল তার কাছ থেকে প্রতি রোগীর জন্য মাত্র ৪ হাজার ৫০০ টাকা গ্রহণ করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বুঝে আমাদের সহযোগিতা করছে বলেই আমরা আরও বেশি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারছি।
বালিয়াকান্দির আলেয়া বেগম জানান, চোখের সমস্যা শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক জীবন থমকে যায়। রান্না করতে গিয়ে বারবার ভুল হতো, হাঁটাচলাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। অপারেশন করানোর মতো টাকা ছিল না। পরে এক পরিচিতজনের মাধ্যমে বাসার সাহেবের কথা জানতে পারি। পরে তার কাছে গেলে তিনিই সব ব্যবস্থা করে দেন।
একই অভিজ্ঞতা কালুখালীর আব্দুল খালেক (৫৮) এর। দিনমজুর এই মানুষটি আগে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই সমস্যায় পড়তেন। চোখে ঠিকমতো দেখতাম না, কাজও ঠিকঠাক করতে পারতাম না। এখন আবার মাঠে কাজ করতে পারছি, বলেন তিনি।
খায়রুল বাসার খান বলেন, নিজের সামর্থ্যের মধ্যেই তিনি এই মানবিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এবং পরিবারের সহায়তাই তার প্রধান ভরসা। তার ভাষায়, টাকা দিলে একসময় শেষ হয়ে যায়, কিন্তু কারও চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে পারলে সেটাই তার সারাজীবনের সম্পদ হয়ে থাকে। কৃষিকাজের পাশাপাশি গ্রাম-গ্রামান্তরে গিয়ে খোঁজ নেন দৃষ্টিহীন হয়ে পড়া মানুষের। তারপর তাদের অপারেশনের ব্যবস্থা করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজের কথা না ভেবে অন্যের জন্য কাজ করাই এখন তার জীবনের মূল লক্ষ্য। পরিবারও তার এই কাজে পাশে আছে। স্ত্রীসহ সবাই তার মানবিক উদ্যোগকে সমর্থন করেন।
গ্রামের দরিদ্র মানুষের কাছে চোখের ছানি একটি বড় সমস্যা। অর্থের অভাবে অনেকেই চিকিৎসা করাতে পারেন না। ফলে ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন তারা। এমন বাস্তবতায় খায়রুল বাসারের এই উদ্যোগ তাদের জীবনে নতুন করে আলো ফিরিয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আকরাম হোসেন বলেন, খায়রুল বাসার খান এলাকায় এক অত্যন্ত সম্মানিত ও নির্ভরতার নাম। দরিদ্র মানুষের কাছে তিনি যেন আশ্রয়ের ঠিকানা। কোনো ছানি রোগীর কথা জানতে পারলেই তিনি নিজেই তার বাড়িতে ছুটে যান। রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, অপারেশনের সব ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তিনি পাশে থাকেন। শুধু নিজ এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শত শত মানুষ তার সহায়তায় ফিরে পেয়েছেন দৃষ্টিশক্তি, ফিরে পেয়েছেন জীবনের আলো।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই রকম আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2017 Cninews24.Com
Design & Development BY Hostitbd.Com