মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০১:৪৯ পূর্বাহ্ন

ফ্যাটি লিভার কমাতে ওষুধ নয়, ভরসা হতে পারে যে ৩ খাবার

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট সময় : 6:50 pm, সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

আধুনিক জীবনের অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণের ফলে দ্রুত বাড়ছে ফ্যাটি লিভার রোগীর সংখ্যা। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম সাধারণ লিভারজনিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

ফ্যাটি লিভার হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে যকৃতের কোষে অস্বাভাবিকভাবে চর্বি জমতে শুরু করে। সাধারণত লিভারে সামান্য চর্বি থাকা স্বাভাবিক হলেও, যখন এই চর্বির পরিমাণ লিভারের মোট ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়, তখন তাকে ‘ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ বলা হয়।

প্রথমদিকে রোগটির তেমন কোনো লক্ষণ না থাকলেও সময়ের সঙ্গে এটি হেপাটাইটিস, লিভার সিরোসিস এমনকি লিভার ফেইলিওরের মতো জটিল সমস্যার কারণ হতে পারে।

ফ্যাটি লিভারের দুই ধরন

হেপাটাইটিস সি, থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন বিপাকীয় রোগের কারণে ফ্যাটি লিভার দেখা দিতে পারে। সাধারণভাবে এটি দুই ধরনের—

১. অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (AFLD)

অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে এই রোগের সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো সম্পূর্ণভাবে অ্যালকোহল বর্জন করা। তা না হলে রোগটি ধীরে ধীরে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

২. নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD)

যারা অ্যালকোহল সেবন করেন না, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ, স্থূলতা এবং অনিয়মিত জীবনযাপন এই রোগের প্রধান কারণ। এর চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা।

ফ্যাটি লিভার কমাতে কেন প্রয়োজন আঁশ?

কোনো একক খাবার ফ্যাটি লিভার নিরাময় করতে পারে না। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাদ্য ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করার পাশাপাশি লিভারে জমে থাকা চর্বি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন অন্তত ৩০ গ্রাম আঁশ গ্রহণের চেষ্টা করা উচিত। শস্য, ডাল, শাকসবজি, ফল, বাদাম ও বিভিন্ন বীজ আঁশের উৎকৃষ্ট উৎস।

নিয়মিত আঁশ গ্রহণ লিভারের গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম—এএলটি (ALT) ও এএসটি (AST)-এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং লিভারের কার্যকারিতা উন্নত করে।

যেভাবে আঁশ লিভারকে সুস্থ রাখে

ইনসুলিন প্রতিরোধ কমায়

ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে গেলে লিভারে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়ে। ওটস, মটরশুঁটি ও বিভিন্ন ফলে থাকা দ্রবণীয় আঁশ রক্তে শর্করার শোষণ ধীর করে, ফলে ইনসুলিনের মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায় না। এতে লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি কমে।

বিশেষ করে ওটসের বিটা-গ্লুকান এবং ইসবগুলের ভুসি এ ক্ষেত্রে বেশ কার্যকর।

চর্বি বিপাক উন্নত করে

আঁশসমৃদ্ধ খাবার শরীরকে চর্বি ভাঙতে ও ব্যবহার করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি দ্রবণীয় আঁশ অন্ত্রে পিত্ত অ্যাসিডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল শরীর থেকে বের করে দেয়। ফলে লিভারে নতুন করে চর্বি জমার সুযোগ কমে যায়।

অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে

শাকসবজি ও লাল চালে থাকা অদ্রবণীয় আঁশ দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। একই সঙ্গে এটি অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করে।

এই ব্যাকটেরিয়াগুলো শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করে, যা লিভারের প্রদাহ কমাতে এবং এর স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

ফ্যাটি লিভারের জন্য সবচেয়ে উপকারী ৩ আঁশসমৃদ্ধ খাবার

বেরিজাতীয় ফল

স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি ও রাস্পবেরির মতো ফল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং আঁশে সমৃদ্ধ। এগুলো লিভারের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে এবং উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিড উৎপাদন বাড়ায়।

তিসি বা ফ্ল্যাক্সসিড

ছোট্ট এই বীজে রয়েছে প্রচুর আঁশ, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড ও লিগনান। এটি প্রদাহ কমায়, ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায় এবং লিভারের চর্বি ভাঙার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।

ওটস, দই কিংবা স্মুদির সঙ্গে মিশিয়ে সহজেই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখা যায়।

ডালজাতীয় শস্য

মসুর ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাদ্য আঁশ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের চমৎকার উৎস। এগুলোর প্রিবায়োটিক বৈশিষ্ট্য অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটায় এবং প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে। ফলে লিভারে চর্বি জমা ও প্রদাহ—দুই-ই কমে।

প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আঁশ বাড়ানোর সহজ উপায়

> সকালের নাস্তায় ওটসের সঙ্গে বেরি ও গুঁড়া তিসি যোগ করুন।

> সাদা চালের বদলে লাল চালের ভাত, সাদা পাউরুটির বদলে বাদামি পাউরুটি এবং সাধারণ পাস্তার পরিবর্তে হোলমিল পাস্তা বেছে নিন।

> প্রতিদিনের রান্না ও সালাদে ডাল ও ছোলা যোগ করুন।

> চিপস বা প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকসের পরিবর্তে তাজা ফল ও লবণবিহীন বাদাম খান।

> দুপুর ও রাতের খাবারের অর্ধেক প্লেট নন-স্টার্চি সবজি দিয়ে পূরণ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে কোনো জাদুকরী ওষুধ নেই। তবে সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত আঁশ গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। প্রতিদিনের খাবারে সামান্য পরিবর্তনই আপনার লিভারকে রাখতে পারে সুস্থ, সক্রিয় এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই রকম আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2017 Cninews24.Com
Design & Development BY Hostitbd.Com