মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৩:৫৪ পূর্বাহ্ন

হাম না চিকেন পক্স, বুঝবেন যেভাবে

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট সময় : 6:48 pm, সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬

ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে শিশুদের মধ্যে নানা ধরনের সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ বেড়ে যায়। ভাইরাস ও জীবাণুঘটিত এসব রোগের শুরুর দিকের উপসর্গগুলো প্রায় একই রকম থাকে—যেমন জ্বর, সর্দি-কাশি এবং ত্বকে র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি। ফলে অনেক সময়ই অভিভাবকেরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান যে শিশুটি আসলে হামে আক্রান্ত নাকি চিকেন পক্সে। তবে একটু সতর্কতার সাথে খেয়াল করলে এই দুই রোগের তফাত এবং অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি সহজে চেনা সম্ভব।

ক্লিনিক্যাল তথ্যের আলোকে রোগগুলোর ভিন্নতা এবং চেনার উপায় নিচে আলোচনা করা হলো:

১. হাম (Measles)

হাম ‘রুবেওলা’ ভাইরাসের কারণে হওয়া একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, যা প্রথমে শ্বাসযন্ত্রকে আক্রমণ করে। এটি এতটাই ছোঁয়াচে যে, কোনো আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ১০ জন অসুরক্ষিত মানুষের মধ্যে ৯ জনই এতে সংক্রমিত হতে পারেন।

লক্ষণ ও ফুসকুড়ির ধরন: সাধারণত ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৭ থেকে ১৪ দিন পর লক্ষণ প্রকাশ পায়। শুরুতে তীব্র শুষ্ক কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং চোখ দিয়ে পানি পড়ার সঙ্গে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উচ্চ জ্বর হতে পারে।

চেনার উপায়: জ্বর ও কাশির ২-৩ দিন পর প্রথম লক্ষণ হিসেবে মুখের ভেতর গালের ভেতরের অংশে ছোট ছোট সাদাটে দাগ দেখা যায়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘কোপলিক স্পট’ বলা হয়। এর ৩-৫ দিন পর ত্বকে লালচে বা বাদামি রঙের ম্যাকুলোপাপুলার (ত্বক থেকে সামান্য উঁচু) ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এই ফুসকুড়ি প্রথমে মুখ, ঘাড় ও কানের পেছন থেকে শুরু হয়ে ধাপে ধাপে নিচের দিকে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ৫-৬ দিন পর ফুসকুড়িগুলো আস্তে আস্তে কমতে শুরু করে।

২. জলবসন্ত বা চিকেনপক্স (Chickenpox)

এটি ‘ভেরিসেলা-জোস্টার’ ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট আরেকটি অতি সংক্রামক রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে বা রোগীর ফুসকুড়ির তরল সরাসরি স্পর্শ করলে ছড়ায়।

লক্ষণ ও ফুসকুড়ির ধরন: ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ১০ থেকে ২১ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়। হালকা থেকে মাঝারি জ্বর, মাথাব্যথা ও শীত শীত ভাবের ১-২ দিনের মধ্যেই সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়।

চেনার উপায়: হামের ফুসকুড়ির মতো এগুলো কেবল লালচে দাগ নয়, বরং খুব দ্রুত পানি বা পুঁজে ভর্তি টসটসে ফোঁস্কায় পরিণত হয় এবং এতে মারাত্মক চুলকানি থাকে। এই দানাগুলো প্রথমে পেট ও পিঠে দেখা দেয় এবং পরে হাত, পা ও সারা শরীরে ছড়ায়। চিকেন পক্সের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, রোগীর শরীরে একই সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ফুসকুড়ি দেখা যেতে পারে—অর্থাৎ কিছু ফোঁস্কা নতুন উঠছে, কিছু পানি ভর্তি হয়ে আছে, আবার কিছু শুকিয়ে খোসা বা পাঁচড়ার মতো রূপ নিয়েছে।

একই রকম উপসর্গের আরও কিছু রোগ

জ্বর ও ত্বকে দানা বা র‍্যাশ হলেই তা হাম বা পক্স নাও হতে পারে। এই সময়ে আরও কিছু রোগ একই রকম উপসর্গ নিয়ে দেখা দিতে পারে:

জার্মান মিজলস বা রুবেলা: এটি রুবেলা ভাইরাসের কারণে হওয়া তুলনামূলক হালকা সংক্রমণ। এতে জ্বর বা সর্দি-কাশি তীব্র হয় না, তবে এর প্রধান বিশেষত্ব হলো কানের পাশে, পেছনে এবং গলার লসিকাগ্রন্থি ফুলে যায় ও ব্যথা করে। ফুসকুড়ি ওঠার ২৪ ঘণ্টা আগে এই উপসর্গ দেখা দেয়। ফুসকুড়িগুলো হালকা লাল দানার মতো হয় এবং সাধারণত ৩ দিনের মধ্যে মিলিয়ে যায়।

হ্যান্ড-ফুট-মাউথ ডিজিজ: সাধারণত ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের এই রোগ বেশি হয়। এতে জ্বরের পাশাপাশি মুখের ভেতরে ঘা এবং হাতের তালু ও পায়ের পাতায় ফোসকার মতো দানা ওঠে। এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

ডেঙ্গু: ডেঙ্গুর প্রকোপ এখন যেকোনো ঋতুতেই দেখা যায়। তীব্র জ্বর ও মাথাব্যথা শুরু হওয়ার ২-৩ দিন পর ত্বকে ছোট ছোট লাল দানা বা র‍্যাশ দেখা দেয়, যা দেখতে অনেকটা হামের মতোই এবং এগুলো কখনো কখনো বেশ চুলকায়।

মেনিনগোকক্কেমিয়া: এটি মেনিনগোকক্কাস ব্যাকটেরিয়াজনিত একটি অত্যন্ত মারাত্মক ও জরুরি অবস্থা, যা সাধারণত ১ বছরের কম বয়সী শিশুদের হয়। তীব্র জ্বর, পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা এবং বমির সাথে ত্বকে ছোট ছোট লাল, বেগুনি বা বাদামি রঙের ছোপ বা দানা দেখা দেয়। দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা না দিলে এই রোগে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

জটিলতা ও চিকিৎসা

হাম ও চিকেনপক্স—উভয় রোগই সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই সেরে যায়। তবে সঠিক যত্ন না নিলে হামের কারণে কান পাকা, তীব্র ডায়রিয়া, অন্ধত্ব, নিউমোনিয়া এবং এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ) হতে পারে, যা প্রতি ১০০০ জনে ১ থেকে ৩ জন শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

করণীয় ও চিকিৎসা

• উভয় রোগের জন্যই নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে এবং শরীর হাইড্রেটেড রাখতে প্রচুর পানি, ডাবের পানি বা তরল খাবার খাওয়াতে হবে।

• জ্বর ও ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল দেওয়া যাবে। তবে ভাইরাল অসুস্থতায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে ভুলেও অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ওষুধ দেওয়া যাবে না, এতে ‘রে’স সিনড্রোম’ নামক মারাত্মক জটিলতার ঝুঁকি থাকে।

• হামের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে দুই দিন ভিটামিন এ সম্পূরক খাওয়ানো চিকিৎসার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

• ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার ৪ দিন আগে থেকে ৪ দিন পর পর্যন্ত হামের রোগী সবচেয়ে বেশি সংক্রামক থাকেন। তাই রোগীকে আলাদা ঘরে রাখা জরুরি।

কখন ডাক্তার দেখাবেন

হামের কারণে যদি নিম্নলিখিত সমস্যা হয়, তাহলে চিকিৎসার যত্ন নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে:

• শ্বাস প্রশ্বাস

• প্রচণ্ড জ্বর যা কমছে না

• তীব্র মাথাব্যথা বা বিভ্রান্তি

• হৃদরোগের আক্রমণ

প্রতিরোধই সর্বোত্তম উপায়

হাম এবং চিকেনপক্স—উভয় রোগই ভ্যাকসিনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। এমএমআর টিকার দুটি ডোজ হামের বিরুদ্ধে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়। এছাড়া হাম আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টিকা নিলে কিংবা ৬ মাসের কম বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে ৬ দিনের মধ্যে ইমিউনোগ্লোবুলিন দিলে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। শিশুদের সঠিক সময়ে টিকাদান নিশ্চিত করা এবং আক্রান্তদের আইসোলেশনে রাখাই এই রোগগুলো ছড়ানো বন্ধ করার একমাত্র উপায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই রকম আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2017 Cninews24.Com
Design & Development BY Hostitbd.Com