
সাক্ষাৎকার: ঘড়ির কাটা তখন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা ছুঁই ছুঁই। মিরপুর স্টেডিয়ামের আকাশের রক্তিম সূর্যটা ধীরে ধীরে পশ্চিমের আকাশে হেলে পড়ছে। এদিকে আমি সাড়ে ৫টা থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) একাডেমি মাঠে হাজির। উদ্দেশ্য চলতি ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের (ডিপিএল) দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি জুবায়ের হোসেন লিখনের বর্তমান পারফরম্যান্স ও ব্যাক্তিগত বিষয় নিয়ে খানিকটা খোশ গল্প। নির্ধারিত সময়ে মাঠে জুবায়েরের অনুপস্থিতিতে ফোন দিলাম তাকে। জবাব এলো, ‘ ভাই, কিছুক্ষন আগে প্যাকটিস শেষ করলাম, ফ্রেশ হয়ে দশ মিনিটের মধ্যেই মাঠে আসছি।’
ফ্রেশ হয়ে তাড়াহুড়া করেই একাডেমি মাঠের দিকে এগিয়ে আসলেন জুবায়ের। শুরুতেই হাসি, দেরি হওয়ার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা। আমিও মাথা নেড়ে সায় দিলাম। বললাম, আরে ব্যাপার না। অন্তত ক্রীড়া প্রতিবেদক হিসেবে বুঝি প্যাকটিসের পর একজন খেলোয়াড়ের ওপর কি পরিমাণ ধকল যায়।
এরপর গল্প শুরু হলো ডিপিএলে পারফরম্যান্স, ব্যাক্তিগত জীবন ও বন্ধু মুস্তাফিজকে নিয়ে জানা অজানা অনেক কথা।
১৯৯৫ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর জামাল পুর জেলায় জন্মগ্রহনকারী জুবায়েরের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় ২০১৪ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম ‘লেগ ব্রেক’ বোলার। লেগ ব্রেক বোলিং দিয়ে একের পর এক সাফল্য পাচ্ছেন প্রতিটি ম্যাচে। এখন তার স্বপ্ন নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।
শুরুতেই জুবায়েরের কাছে জানতে চেয়েছিলাম ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে (ডিপিএল) নিজের পারফরম্যান্স প্রসঙ্গে। একদিকে আইপিএলে মুস্তাফিজ আতঙ্কে কাঁপছে ব্যাটসম্যানরা। আর এদিকে আপনি। আসলে নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট?
জুবায়ের হোসেন লিখন: হ্যাঁ, শুরুটা আল্লাহ’র রহমেত অনেক ভালো হয়েছে। প্রথম চারটা ম্যাচ অনেক ভালো করেছি। কিন্তু মাঝপথে এসে কিছুটা দমকে যাই। দেখা যাচ্ছে ভালো বল দিলেও ব্যাটসম্যানরা সেটিকে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে দিচ্ছে। বুঝা যায় না কখন কিভাবে কি হয়ে যায়। শেষের

তিনটা ম্যাচ বলতে গেলে একেবারে খারাপ হয়েছে।
এবারের ডিপিএলে পেসারদের চেয়ে স্পিনাররাই বেশি সুবিধা পাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার সিলভা, নাইম ইসলাম, কাপালির মতো বোলাররা বেশ ভালো বল করছেন। লিখনের কাছে প্রশ্ন ছিল এবারের উইকেটগুলো স্পিনার বোলারদের কেমন সহায়তা করছে?
জুবায়ের হোসেন লিখন: আসলে উইকেট নিয়ে আমি তেমন কিছু জানি না। উইকেটটা আমার কাছে মূল বিষয় নয়। আসলে বোলিং করতে নামলে কোন সময় কি হয়ে যায় বুঝাটাই মুশকিল। উইকেট নিয়ে আমার তেমন কোন ভাবনা নাই।
বড় ভাইয়ের অনুরোধে মিডিয়াম পেস ছেড়ে লেগ ব্রেক বোলিং শুরু করা জুবায়ের ডিপিএলে এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। আসরটিতে নিজেকে শেষ পর্যন্ত কোথায় দেখতে চান?
জুবায়ের হোসেন লিখন: সত্যি কথা বলতে কি? টুর্নামেন্ট যখন শুরু হয় তখন আমার ইচ্ছে ছিলো সেরা পাঁচে থাকা। এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় উইকেট শিকারি হিসেবে ভালোই লাগছে। শেষ পর্যন্ত সেরা পাঁচ জনের মধ্যেই থাকতে চাই।
ঐতিহ্যবাহী আবাহনীর হয়ে ড্যাসিং ওপেনার তামিম ইকবালের নেতৃত্বে খেলা জুবায়েরের দল নিয়ে চিন্তাভাবনা সুদূরপ্রসারী। প্রয়োজনে সে দলের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতেও। প্রস্তত এমনটাই উঠে এলো তার কথায়।
জুবায়ের হোসেন লিখন: দল নিয়ে চিন্তাভাবনা বলতে এখনো প্রথম রাউন্ডের আমাদের ৪টা ম্যাচ বাকি। আর এই ৪টা ম্যাচই আমারদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ চার ম্যাচে অন্তত ৩টা ম্যাচ না জিততে পারলে আমরা হয়তো সুপার লিগ খেলতে পারবো না। তাই আমাদের টার্গেট থাকবে সবাই তার শতভাগ উজাড় করে দেয়ার। ইনশাআল্লাহ আমরা পরবর্তী ম্যাচে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে নামবো এবং আল্লাহর রহমতে আমরা জিতবো।
এবার ডিপিএল ছেড়ে কথা হলো প্রিয় বন্ধু আইপিএল কাঁপানো মুস্তাফিজ প্রসঙ্গে। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) সর্বোচ্চ আসরটিতে ১৪ ম্যাচ খেলে ১৬ উইকেট নিজ ঝুলিতে ভরেছেন জাতীয় দলের এই ‘কাটার মাস্টার’। আসলে খেলার বাইরে মুস্তাফিজ কেমন? জানতে চাওয়া হয়েছিল জুবায়েরের কাছে।
জুবায়ের হোসেন লিখন: মুস্তাফিজ আর আমি এক সাথে নেটে বল করেছি। একাডেমিতে আমরা একই রুমে দুই জন থাকতাম। আসলে শুরু থেকেই সে ভালো বল করতো। তবে প্রথমে কাটার মারতে না পারলেও বর্তমানে সে যে কাটার মারে তা বিশ্বের যে কোন ব্যাটসম্যানের সামাল দিতে কষ্ট হয়ে যাবে। আসলে ও অনেক ভালো করছে। সামনেও অনেক ভালো করবে।
একই রুমে থেকেছেন। মাঠের প্রসঙ্গ কিংবা সতীর্থের খাতির বাদ দিলাম। এবার জানতে চাই বন্ধু হিসেবে মুস্তাফিজ কেমন ?
জুবায়ের হোসেন লিখন: মুস্তাফিজের সঙ্গে টানা ২ বছর থাকার পর যা দেখলাম আসলে ও অনেক ভালো মানুষ। একদম সাদা মনের মানুষ। আর সে জন্যই আল্লাহ তাকে এতো কিছু দিয়েছেন।
আইপিএলের প্লে-অফের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সাকিবের মুখো-মুখি মুস্তাফিজ। দুই জনই আবার জাতীয় দলের সতীর্থ। হাই ভোল্টেজ ম্যাচটিতে যে দল হারবে তাদের বিদায় নিতে হবে। তাহলে সাকিব নাকি মুস্তাফিজ কাকে পছন্দ জুবায়েরের?
জুবায়ের হোসেন লিখন: এখানে আমি কোন টিমকে সার্পোট করবো না আমি তাদের দুইজনকেই সাপোর্ট করবো। আমি চাইবো যে দুই জনেই ভালো পারফরম্যান্স করুক। কোন টিম ভালো করছে না করছে সেটা দেখাটা আমার কাছে গুরত্বপূর্ণ নয়। তবে সাকিব ভাই আমার আইডল আর মুস্তাফিজ আমার বন্ধু তাই আমি চাই দুই জনই দারুণ পারফর্ম করুক।
সর্বশেষ জানতে চেয়েছিলাম জুবায়েরের প্রিয় ক্রিকেটার কে এবং সেরা উইকেট কোনটি।
জুবায়ের হোসেন লিখন: আমার প্রিয় ক্রিকেটার শেন ওয়ার্ন। আমি সব সময় চেষ্টা করি ওনার মতো বড় বড় টার্ন করে বল করতে। আমি সব সময় ওনার বল ফলো করতাম। তবে তিনি যেহেতু এখন নেই। তাই আমি এখন অমিত মিশ্র এবং ইমরান তাহিরকে বেশি পছন্দ করি। তাদের বল করার দিক গুলো লক্ষ্য করছি। আর ব্যাটসম্যান হিসেবে বিরাট কোহলি। আর সেরা উইকেটটিও বিরাট কোহলির।
গুরুত্বপূর্ণ সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
জুবায়ের হোসেন লিখন: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। সকলে আমার জন্য দোয়া করবেন।