
দীর্ঘদিন কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় সিরাজগঞ্জের কৃষকেরা একপ্রকার পাট চাষের আগ্রহই হারিয়ে ফেলেছিলেন। এমনকি জেলার এমন কিছু এলাকা ছিল, যেখানে টানা তিন দশক ধরে পাটের আবাদই বন্ধ ছিল। তবে বহুমুখী ব্যবহারের কারণে বর্তমানে পাটজাত পণ্যের বৈশ্বিক ও স্থানীয় চাহিদা বেড়েছে। ফলে বাজারে আবার পাটের সুদিন ফিরে এসেছে, চাঙ্গা হয়েছে দামও। বর্তমানে নতুন পাট বাজারে প্রতি মণ ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে।
তিন দশক পর মিলল আশাতীত ফলন : দীর্ঘ ৩০ বছর পর এ বছর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার চলনবিল এলাকার পারকোলা গ্রামে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে পাটের আবাদ করা হয়েছে। প্রথমবারেই পাওয়া গেছে চোখধাঁধানো ও আশাতীত ফলন। পারকোলা এলাকার কৃষক শহিদুল হক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “দাম না থাকায় আমরা ৩০ বছর ধরে পাটের আবাদ করিনি। এ বছর কৃষি অফিসের পরামর্শে চাষ করেছি। যে ফলন হয়েছে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি! প্রতিটি পাট গাছ ১২ থেকে ১৪ ফুট লম্বা হয়েছে এবং বিঘা প্রতি ১৫ মণ করে উৎপাদন পেয়েছি।”
মাঠে মাঠে চলছে জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর উৎসব : সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন পুরোদমে চলছে পাট কাটা। খাল-বিল ও বন্যার পানিতে পাট জাগ দেওয়া, ধোয়া এবং আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। গ্রামের মেঠোপথ ও খাল-বিলের ঘাটে সুতা আর পাটের শোলার সুবাস ফের মনে করিয়ে দিচ্ছে আবহমান বাংলার সেই সোনালি অতীত। খরচের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় এবং ভালো দাম পাওয়ায় নতুন করে পাটবীজ সংগ্রহ ও আবাদে ঝোঁক বাড়ছে স্থানীয় চাষীদের।
পরিসংখ্যান ও উৎপাদন চিত্র : সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় মোট ১৪ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে দেশি, মেছতা, কেনাফ, জেআরও-৫২৪, সবুজ সোনা এবং বারি-১ জাতের পাট উল্লেখযোগ্য। গড়ে বিঘা প্রতি ১০ থেকে ১২ মণ (পারকোলায় ক্ষেত্রবিশেষে ১৫ মণ) পাট উৎপাদন হয়েছে, যেখানে বিঘাপ্রতি খরচ ছিল ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা।
যা বলছেন কৃষি কর্মকর্তারা : শাহজাদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “পারকোলা এলাকার কৃষকেরা ধান ও সরিষা চাষের পর জমিগুলো পতিত ফেলে রাখতেন। এবার আমরা তাদের উদ্বুদ্ধ করায় তারা পাট চাষ করেন এবং আশাতীত ফলন পান। বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। আগামীতে এই উপজেলায় ব্যাপকহারে পাট চাষ হবে বলে আশা করছি।” উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্না ইয়াসমিন সুমী বলেন, “আমার উপজেলায় ১ হাজার ৬৭০ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। পাটের নানাবিধ ব্যবহারের কারণে চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়েছে। এটি এখন একটি অত্যন্ত লাভজনক ফসলে পরিণত হয়েছে।”
সিরাজগঞ্জে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে এম মঞ্জুরে মাওলা বলেন, “কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের পরামর্শে কৃষকেরা পাট চাষ করেছেন। খরচ কম ও লাভ বেশি হওয়ায় চাষের পরিধি দিন দিন বাড়ছে। চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলন ও বাজারদর ভালো থাকায় কৃষকেরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট।”