
জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীকে দেয়া ফাঁসির রায়ের (আপিল বিভাগেও ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল থাকায়) বিরুদ্ধে করা রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত এবং আপিল বিভাগে বহাল থাকা মৃত্যুদণ্ডের রায়ই অবশেষে ‘চূড়ান্ত রায়’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। এর মধ্য দিয়ে নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত যুদ্ধাপরাধ এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ দালিলিক প্রমাণসহ সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে ইতিহাসের অংশ হলো। নিমাজীর যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে যে আলাপমালা এবং অভিযোগনামা একাত্তরের পর থেকে জনপরিসরে জারি ছিল, তার দালিলিক প্রমাণসহ সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক সত্য প্রমাণিত হলো। এর মধ্য দিয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক সাফল্য, কৃতিত্ব এবং গৌরবের পাশাপাশি রাজাকার, আলশাম্স এবং আলবদর বাহিনীর জঘন্য যুদ্ধাপরাধের বিচার না করতে পারার যে গ্লানি, দায় এবং কলঙ্ক একাত্তর-উত্তর পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে এ দেশের মানুষ বহন করছিল, নিজামীর ফাঁসির রায় রিভিউ আপিলে বহাল থাকার মধ্য দিয়ে মূলত ইতিহাসের সে দায় এবং কলঙ্ক মোচনের ক্ষেত্রে আমরা আরো এক ধাপ এগিয়ে গেলাম। ২০১০ সালের আগস্টের ২ তারিখ নিজামীকে মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রথম গ্রেফতার দেখানো হয় যদিও তিনি ২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত প্রদানের একটি মামলায় গ্রেফতার হন। এর পর দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে মামলার পক্ষে এবং বিপক্ষে নানা যুক্তিতর্ক এবং দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপনের পর ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে আনীত ১৬টি অভিযোগের মধ্যে ৮টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। আর এ আটটি অভিযোগের মধ্যে চারটি অপরাধের (অভিযোগ নং ২, ৪, ৬, ও ১৬) জন্য তাকে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়। একই বছরের ১৩ নভেম্বর তিনি সর্বোচ্চ আদালতে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। দীর্ঘ শুনানির পর ২০১৬ সালের ৬ জানুয়ারি আপিল বিভাগেও তার ফাঁসির দণ্ডের রায় বহাল রাখা হয়। ২০১৬ সালের ২৯ মার্চ নিজামী আপিল বিভাগের রায়ের ‘রিভিউ আবেদন’ করেন যার শুনানি হয় মে’র ৩ তারিখ এবং ওই দিনই ধার্য করা হয় যে, রিভিউ আবেদনের রায় দেয়া হবে মে’র ৫ তারিখ। শেষ পর্যন্ত রিভিউ আবেদনের রায়ে নিজামীর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে দেয়া রায় বহাল রাখা হয়। নিজামী হচ্ছেন পঞ্চম ব্যক্তি এ তালিকায় যারা দালিলিক প্রমাণসহ দেশের নিজামীর দণ্ড বহাল : ধাপে ধাপে দায়মুক্তিসর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক ‘শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে প্রমাণিত এবং ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। এর আগে আরো চারজন (কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, মুজাহিদ এবং সাকা চৌধুরী) যুদ্ধাপরাধী এবং একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধী হিসেবে ফাঁসির দণ্ড পেয়েছেন এবং ইতোমধ্যে যাদের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। রিভিউ আবেদনের রায়ে বলা হয় ‘ফরংসরংং’ বা ‘খারিজ’। অর্থাৎ তার মৃত্যুদণ্ড বহাল আছে। আপিল বিভাগেও তাকে দেয়া ফাঁসির দণ্ড বহাল রাখা হয়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ যেখানে বলা হয়, ‘মতিউর রহমান নিজামী একজন প্রখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত (আসামি পক্ষের দাবি অনুযায়ী) হওয়ার পরও কোরানের আদেশ ও
মহানবীর শিক্ষার পরিপন্থী হয়ে আলবদর বাহিনী গঠন করেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিকামী মানুষদের হত্যা ও নিধন এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর কর্মকাণ্ডকে সহযোগিতা ও অনুমোদন আদায়।’… ‘আমরা ধরে নিতে বাধ্য হচ্ছি যে মতিউর রহমান নিজামী ইসলামিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও সচেতনভাবে এবং স্বেচ্ছায় ‘আল্লাহ’ ও পবিত্র ধর্ম ‘ইসলাম’-এর নামের অপব্যবহার করে ‘বাঙালি জাতিকে’ সমূলে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন।’ তাই, নিজামীর ‘ফাঁসির দণ্ডাদেশ’ আরো একটি বিষয় আমাদের সামনে হাজির করে যে, ধর্মের নামে যারা যুদ্ধিজীবীদের হত্যা করায় তারা মানবতাবিরোধী অপরাধী। যেটা আজকের দিনেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়