
আল কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করার পর এই জঙ্গি গোষ্ঠীটি তার পুরনো জৌলুষ হারিয়েছে। খর্ব হয়েছে তাদের শোর্য বীর্য। উপর্যুপরি মার্কিন বাহিনীর হামলায় তারা এখন বিপর্যস্ত। এ সুযোগে তাদের স্থান দখল করেছে জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএস। তারপরও আল কায়দাকে বিপজ্জনক হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতবছর প্যারিসে শার্লি এবদো কার্যালয়ে আল কায়দার সন্ত্রাসী হামলা এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে তাদের একাধিক হত্যাযজ্ঞ এটাই প্রমাণ করে যে, তারা এখনো বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা চালাতে সক্ষম। এছাড়া সিরিয়া ও ইয়েমেনে এ গোষ্ঠীটি উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে এবং আইএসের বর্বরতার বিকল্প হিসেবে নিজেদের সফলভাবে উপস্থাপন করছে।
পাকিস্তানে ২০১১ সালের ২ মে আল কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করেছিল মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা। এরপর আশি দশকের শেষ নাগাদ গড়ে ওঠা ওই জঙ্গি গোষ্ঠীটি নানাভাবে পর্যুদস্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ে মারা গেছে এর অনেক নেতা ও সদস্য। পরে অবশ্য লাদেনের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন দলের নতুন প্রধান আইয়াম আল জাওয়াহিরি। এ নিয়ে দলটিতে নানা ভাঙনও দেখা দিয়েছে, তৈরি হয়েছে একাধিক উপদল।
আল কায়দার প্রকৃত জন্মস্থান ইরাক হলেও আইএসের উত্তানের পর তারা সেখানে কোনঠাসা অবস্থায় রয়েছে। ২০১৪ সালে ইরাক ও সিরিয়ার বিরাট ভূখণ্ড দখলে নেয়ার পর ইসলামি ‘খিলাফত’ ঘোষণা করেছে আইএস। এই গোষ্ঠীর জঙ্গিরা ব্রাসেলস, প্যারিস, তুউনিশিয়া, লেবানন, ইয়েমেন ও সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি তারা মিশরে রুশ যাত্রীবাহী বিমানেও হামলা চালিয়েছিল। এসব হামলায় শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। এই দলের আত্মস্বীকৃত নেতা আবু বকর আল বাগদাদীর বশ্যতা স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠী। ওইসব গোষ্ঠীগুলোর সহযোগিতা নিয়েই আইএস এখন মিশরের সিনাই উপত্যকা ও লিবিয়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
ইসলাম ও জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর ওপর দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন প্যারিস বিশেষজ্ঞ জ্যঁ পিয়েরে ফিলিউ। তিনি মনে করেন, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতার কারণে আইএস তার প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর চাইতে অনেক এগিয়ে গেছে এবং আজকের এই স্থানে আসতে পেরেছে। ওই একই কারণে আইএসের কাছে মার খেয়েছে আল কায়দাও।
ওয়াশিংটনের ব্রুকলিন ইনস্টিটিউটের গবেষক উইলিয়াম ম্যাকক্যান্টও আইএসের কাছে আল কায়দার এ পরাজয়ের কথা স্বীকার করছেন। তবে তিনি মনে করেন, এই জঙ্গি গোষ্ঠীটি পুনরায় ওঠে আসতে শুরু করেছে। যে কারণে সিরিয়া ও ইয়েমেনে তারা নিজেদের একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। প্রেসিডেন্ট বশির আল আসাদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে আল নুসরা ফ্রন্ট যারা আল কায়দারই অঙ্গ সংগঠন।
ইয়েমেনের শক্তিমান জঙ্গি গোষ্ঠী হচ্ছে আল কায়দা ইন দা আরাবিয়ান পেনেনসুয়েলা (একিউএপি)। তারা সরকার ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যকার সংঘর্ষের সুযোগে সেখানকার একটি বিরাট অংশ দখল করে ফেলেছে। এজন্যই ইয়েমেনে একিউএপি-কে একটি সুসংগঠিত ও বিপজ্জনক গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করে থাকে ওয়াশিংটন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ হামলা চালাতেও সক্ষম হয়েছে। এদের উল্লেখযোগ্য হচ্ছে প্যারিস হামলা। ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে প্যারিসের ব্যাঙ্গাত্মক সাময়িকী শার্লি এবদোর কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ১২ জনকে হত্যা করে।
আল কায়দার অন্য একটি শাখা হচ্ছে আল কায়দা ইন দা ইসলামিক মাগরেব (একিউআইএম)। এই গোষ্ঠীটিও মালি, বুরকিনা ফসো ও আইভরি কস্টের বিভিন্ন হোটেল ও রেস্টুরেন্টে হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছে। তাদের এসব ছোটখাট হামলাগুলোকে ইসলামিক স্টেটের প্রভাবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন কিছু মার্কিন বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ মনে করছেন, উত্তর আফ্রিকা, সোমালিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনে আগের চাইতেও শক্তিশালী হয়ে ওঠেছে এই আল কায়দা গোষ্ঠী। ইয়েমেনের আলকায়দা প্রধান বিভিন্ন স্থানে আইএসের হামলার নিন্দাও করেছেন।
ইয়েমেনে আল কায়দাকে বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। যার কারণেই সেখানে তারা ড্রোন হামলাও চালিয়ে যাচ্ছে। এপ্রিল মাসের গোড়ার দিকে সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা অ্যালাইন রোডিয়ের ফরাসি নিউজ ওয়েবসাইট ‘আটলান্টিকো’কে বলেছিলেন, ‘এখন আইএস আমাদের সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে। এ সুযোগে আল কায়দা ভিতরে ভিতরে নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করছে।’
তিনি আরো বলেন, খিলাফত ঘোষণার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের শাসন কায়েম করার ফলে আইএস পশ্চিমাদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। যার ফলে সিরিয়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট ও রাশিয়ার বিমান হামলায় হাজার হাজার আইএস সমর্থক নিহত হয়েছে। তাদের কঠোর শাসনের কারণে একনিষ্ঠ ভক্তরাও বিকল্প গোষ্ঠীর সন্ধান করছে, এটি যে অবশ্যই আল কায়দা তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।
এজন্যই সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা অ্যালাইন রোডিয়ের বলেছেন,‘আল কায়দার প্রতিষ্ঠাতা জনকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ওই গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড শেষ হয়ে গেছে এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। তাদের জিহাদ আরো কয়েক যুগ ধরে অব্যাহত থাকবে।’