
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে রাজনীতি করছেন। এর মধ্যে ৩৪ বছর বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা উত্থান-পতন ও কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। রাজনৈতিক কারণে পাঁচবার কারাবরণ করেছেন। এমনকি ঢাকায় একটি বাসায় আড়াই মাস আত্মগোপনেও ছিলেন।
সম্প্রতি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের রাজনৈতিক জীবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমি ৪০ বছর ধরে রাজনীতি করছি। এর মধ্যে ৩৪ বছর বিএনপি করেছি। রাজনীতিতে আমার আগ্রহ ছিল না। এই ৩৪ বছরে বিএনপির সময়ে অনেক উত্থান-পতন দেখেছি। কঠিন সময় গেছে। জেলে গিয়েছি পাঁচবার। তারপর ঢাকায় একবার একটি বাসায় আড়াই মাস লুকিয়ে ছিলাম। বাসা থেকে বের হইনি। এভাবে গ্রেফতার এড়িয়ে এবং নানা ধরনের পুলিশের অপতৎপরতার শিকার হয়েছি অনেকবার। মামলা মোকাবিলা করতে হয়েছে। এগুলো খুবই মনে পড়ে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে স্পিকার বলেন, সবসময় বেগম জিয়ার যে স্নেহ ও সহচর্য পেয়েছি, তা ভুলবার নয়। দুঃসময়ে তিনি আমাদের অনেক সাহস দিয়েছেন। সবসময় আমার প্রতি তিনি সদয় ছিলেন। তার কাছ থেকে সবসময় ভালো ব্যবহার পেয়েছি। ঈদের দিন সন্ধ্যার পর তিনি দুজন মাত্র অতিথিকে নিয়ে ডিনার করতেন। আমাদের নিয়ে তিনি খাবার পরিবেশন করতেন এবং টুকটাক গল্প করতেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় খালেদা জিয়াকে পাকিস্তানি বাহিনীর গ্রেফতারের প্রসঙ্গ তুলে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী বেগম জিয়াকে অনেক খুঁজে গ্রেফতার করেছিল। ঢাকায় তাদের আত্মীয়ের বাসা থেকে তারা তাকে গ্রেফতার করে। অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা বা কাউকে এভাবে খুঁজতে যায়নি। যারা নিজেদের বিরাট মুক্তিযোদ্ধা কিংবা স্বাধীনতার একচ্ছত্র দাবিদার মনে করতেন, তাদেরও সেনাবাহিনী এভাবে খুঁজতে যায়নি।
তিনি বলেন, জিয়ার মধ্যে তারা কী পেয়েছিল? তারা হয়তো বুঝতে পেরেছিল, তিনি ভবিষ্যতের একজন জননেত্রী হতে পারেন। এই সন্দেহ থেকেই হয়তো তাকে গ্রেফতার করেছিল। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি তার স্বামীকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন, সে কারণেও হয়তো তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় জেড ফোর্স গঠনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় জুলাই মাসের একসময় তেলঢালায় যখন ছাত্রদের প্রশিক্ষণ চলছিল এবং জেড ফোর্স সংগঠিত হচ্ছিল, একদিন আমি কমান্ডার জিয়াকে দেখতে গেলাম। গিয়ে দেখি, তিনি একটি চিঠি লিখছেন।
তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, স্যার, কী লিখছেন? উত্তরে তিনি বললেন, একটি চিঠি লিখছি। কাকে লিখছেন জানতে চাইলে তিনি বললেন, পাকিস্তানের জেনারেল জামশেদকে লিখছি।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি আমাকে চিঠিটি পড়তে দিলেন। আমি দেখলাম, ইংরেজিতে লেখা— মাই ডিয়ার জেনারেল জামশেদ, মাই ওয়াইফ খালেদা, ইজ ইন ইউর কাস্টডি। ইফ ইউ ডু নট রেসপেক্ট হার আই উইল কিল ইউ সামডে অর্থাৎ, আমার স্ত্রী তোমাদের হেফাজতে আছে। যদি তার সঙ্গে ভালো আচরণ না কর এবং সম্মান প্রদর্শন না করো, একদিন আমি তোমাকে হত্যা করব। —মেজর জিয়া।
তিনি আরও বলেন, এরপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, এখন কি চিঠিটা ডাকযোগে পাঠাব? তিনি চিঠিটা একজন মেজরের হাতে দিলেন। পরের দিন তারা দেওয়ানগঞ্জে অপারেশনে গেলে সেখানে একটি ডাকবাক্সে চিঠিটি ফেলে দেন। চিঠিটি ঠিকই জেনারেল জামশেদের কাছে পৌঁছেছিল।
জেনারেল জামশেদের দেওয়া উত্তরের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জেনারেল জামশেদ চিঠির উত্তরে জানিয়েছিলেন, এই চিঠির প্রয়োজন নেই। একজন অফিসারের স্ত্রীকে কীভাবে সম্মান করতে হয়, আমরা সেটা জানি।