মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৩:১১ পূর্বাহ্ন

স্বজন হারানো ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যেও গাজায় সেরা শিক্ষার্থী সাবা রাবাহ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : 3:18 pm, সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

উচ্চ মাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষার মাত্র কয়েক দিন আগে গাজার মধ্যাঞ্চলে অস্থায়ী আশ্রয়ের বিপরীত পাশের একটি বাড়িতে বোমা হামলা হয়। ১৮ বছর বয়সী সাবা রাবাহ ও তাঁর পরিবার তখন সবকিছু ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

যুদ্ধের মধ্যে এটিই ছিল তাঁর জীবনের সর্বশেষ দুর্ভোগ। এর আগে যুদ্ধে তিনি বাবাকে হারিয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে পারিবারিক বাড়ি। বারবার বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে পুরো পরিবারকে।

তবে সব প্রতিকূলতাকে জয় করে ফিলিস্তিনের জাতীয় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা ‘তাওজিহি’র বিজ্ঞান বিভাগে দেশের সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেছেন সাবা রাবাহ ।

ফিলিস্তিনি অঞ্চলের মাগাজি থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর গাজায় এবারই প্রথম এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

গাজার মধ্যাঞ্চলীয় আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে স্বজন ও প্রতিবেশীদের উপস্থিতিতে সমাবর্তনের পোশাক পরে তিনি এএফপিকে বলেন, ‘আমি ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ নম্বর পেয়েছি। বিজ্ঞান বিভাগে সারা দেশে প্রথম হয়েছি।’

তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো গত জুনে গাজা, ইসরাইল-অধিকৃত পশ্চিম তীর, মিসর ও ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী বসবাসকারী আরও কয়েকটি দেশে একযোগে তাওজিহি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার অধিকাংশ স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এতে কয়েক হাজার শিশু আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

বাড়িঘর ও পুরো পাড়া ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর টিকে থাকা অনেক স্কুল ভবনই কয়েক লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

এ বছর প্রায় ৮৯ হাজার শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগে ছিল ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছেন সাবা রাবাহ।

তিনি তাঁর এই সাফল্য প্রয়াত বাবা ফায়েদ রাবাহ, মা, ভাইবোন এবং শিক্ষকদের উৎসর্গ করেছেন।

ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দে ভেসে যায় তাঁদের পরিবার।

ঢোলের তালে নেচেছেন তরুণরা। করতালি ও উল্লাসে ফেটে পড়েন প্রতিবেশীরা।

সাবা স্বজনদের আলিঙ্গন করেন, ছবি তোলেন এবং ফুলের তোড়া গ্রহণ করেন। দেয়ালে ঝুলছিল তাঁর প্রয়াত বাবার প্রতিকৃতি, যা উৎসবের মাঝেও হারানোর বেদনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল।

দুই বছরের যুদ্ধের মধ্য দিয়েই তিনি এই সাফল্যের পথ তৈরি করেছেন।

সাবা বলেন, ‘আমার বাবা ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউ-এর স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।’

তিনি জানান, ২০২৪ সালের জুনে ইসরাইলি বিমান হামলায় তাঁর বাবা নিহত হন।

তবে বাবার মৃত্যুর আগেই আল-মাগাজি শিবিরে ইসরাইলি বাহিনী প্রবেশ করলে তাঁদের পরিবার দুই দফা বাস্তুচ্যুত হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তাঁদের বাড়িও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

সাবা বলেন, ‘আমরা এতবার বাস্তুচ্যুত হয়েছি যে, সঠিক সংখ্যা এখন আর মনে নেই।’

তিনি বলেন, ‘এত বাস্তুচ্যুতি আর ভয় ছিল। আমাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার অর্ধেক বই হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমি কখনও আমার লক্ষ্য থেকে সরে যাইনি।’

পরীক্ষা চলাকালেও বিপদ ছিল একেবারে কাছেই ছিল।

তিনি বলেন, ‘পরীক্ষার কয়েক দিন আগে আমাদের বাড়ির বিপরীত পাশের বাড়িতে বোমা হামলা হয়। এরপর আমরা আমাদের আশ্রয়ও হারাই।’

বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা পড়াশোনাকে আরও কঠিন করে তোলে।

কখনও কখনও তাঁকে ব্যক্তিগত কোচিং করতে এবং পরীক্ষায় অংশ নিতে অন্য এলাকায় যেতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পথে কী ঘটতে পারে, তা না জেনেই যেতে হয়েছে।’

সাবা বলেন, ‘আমার স্বপ্ন মেডিকেলে ভর্তি হওয়া। এ স্বপ্ন আমার বাবারও ছিল।’

তিনি বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় আশা, আমার কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি মিলবে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার জন্য আমি পূর্ণ বৃত্তি পাব।’

তাঁর ৫২ বছর বয়সী মা ফেরিয়াল আহমেদ রাবাহ বলেন, দীর্ঘ শোক আর কষ্টের পর তাঁদের পরিবারে আবার আনন্দ ফিরে এসেছে।

তিনি স্মরণ করেন, তাঁর মেয়ে অনেক সময় মোবাইল ফোনের টর্চের আলোয় পড়াশোনা করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

এই রকম আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2017 Cninews24.Com
Design & Development BY Hostitbd.Com