সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ১২:৪২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কুড়িগ্রামে সড়ক বিভাগের শাপলা চত্বর হতে তারামন বিবি মোড় পর্যন্ত আরসিসি ঢালাই রাস্তার কাজ এগিয়ে চলছে মানবিক সহায়তায় অ্যাম্বুলেন্স সেবার হাত বাড়িয়ে দিলেন চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম টাঙ্গাইলে কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার ও চারা প্রদান করলেন মৎস্য প্রতিমন্ত্রী সাবেক প্রেমিক দেবকে নিয়ে যা বললেন শুভশ্রী তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা অনুষ্ঠিত আজকের স্বর্ণের দাম: ০৫ জুলাই ২০২৬ ৫ জুলাই ২০২৬: ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি কত? জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা ইসলামী আন্দোলনের গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্রের দায়িত্ব পেলেন আবু হানিফ এমবাপ্পের পেনাল্টিতে প্যারাগুয়েকে হারিয়ে শেষ আটে ফ্রান্স

নির্বাচনে আগ্রহ হারাচ্ছে বিএনপি

রিপোর্টার নাম
  • আপডেট সময় : 9:25 am, শনিবার, ২ এপ্রিল, ২০১৬

জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই এবং র‌্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীকে দিয়ে বিরোধী দল মনোনীত প্রার্থী ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ধাওয়ার ওপর রেখে বিজয় ছিনিয়ে নেয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আগ্রহ হারাচ্ছে তৃণমূল বিএনপি। বিশেষ করে পরবর্তী ধাপের নির্বাচনগুলোতে আরো বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করে খোদ কমিশন অসহায়ত্ব প্রকাশ করায় এ ইস্যুতে ভাটার টান আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। প্রকাশ্যে এ ব্যাপারে কেউ কিছু না জানালেও এরই মধ্যে বেশকিছু প্রার্থী গোপনে তাদের নির্বাচনী কার্যক্রম পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছে, কেউ কেউ আবার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে ভোটের মাঠ ছাড়ার কথা ভাবছেন বলেও তৃণমূল নেতাদের অনেকেই জানিয়েছেন।
downloadতবে কৌশলগত কারণে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ভরাডুবির পরও দলীয় হাইকমান্ড নির্বাচনে থাকার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। এমনকি ইউপি নির্বাচনের আগামী ধাপগুলোতে আরো বড় ধরনের জালিয়াতি হলেও এ অবস্থান থেকে বিএনপি পিছুপা হবে না।

দলের শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতা জানান, গত ৫ জানুয়ারির মতো আওয়ামী লীগকে আর কোনো নির্বাচনেই ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার সুযোগ দেবে না বিএনপি বরং এ ইস্যুতে সরকারের স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি ও জালিয়াতির চিত্র তারা ‘রেকর্ডে’ রাখার চেষ্টা করবেন। যাতে জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের অরাজকতার এসব তথ্য-প্রমাণ বহির্বিশ্বের পাশাপাশি দেশের জনগণের সামনে প্রমাণসহ তুলে ধরা যায়।
যদিও হাইকমান্ডের এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার সঙ্গে তাল মেলাতে নারাজ তৃণমূল বিএনপি। তাদের ভাষ্য, প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেভাবে ‘স্টিমরোলার’ চালানো হয়েছে তাতে বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীর জীবন রক্ষাই দায়। তাই সময় থাকতে প্রাণ হাতে নিয়ে সরে পড়াই শ্রেয় বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে তৃণমূলের বেশকিছু নেতা জানান, মূলত মামলার জাল থেকে রেহাই পেতেই অনেকে স্বেচ্ছায় ইউপি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। অনেক এলাকায় বিএনপি দলীয় যোগ্য প্রার্থীকে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এছাড়া অনেকের আশঙ্কা দুই ধাপের মতো অন্য ধাপগুলোতেও নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। সেক্ষেত্রে নির্বাচনী খরচার পুরো টাকাটাই গচ্চা যাবে। আবার সব বাধা পেরিয়ে নির্বাচনে জয়ী হলেও মামলার অজুহাত দেখিয়ে তাদের বরখাস্ত করারও সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সবাই এখন গা বাঁচিয়ে চলছেন।
তবে বিএনপির প্রথম সারির একাধিক নেতার দাবি, তৃণমূলের নির্বাচন বিমুখ হওয়ার খবর পুরোপুরি ভিত্তিহীন। বরং দলীয় মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে তীব্র লড়াই চলছে বলেও দাবি করেন তারা।
যদিও বিএনপির মাঠপর্যায়ের সক্রিয় নেতাদের অনেকেই তৃণমূলে নির্বাচনে আগ্রহ হারানোর কথা নিঃসংকোচে স্বীকার করেছেন। তাদের ভাষ্য, শুধুমাত্র রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার টার্গেট নিয়ে কেউ কেউ মনোনয়ন যুদ্ধে নেমেছেন। কেননা দল থেকে মনোনয়ন পেলে স্থানীয় নেতাকর্মী-সমর্থকদের কাছে যেমন মর্যদা বাড়বে তেমনি কেন্দ্রেও পরিচিতির ক্ষেত্র তৈরি হবে। তাই সবকিছু জেনে বুঝে তারা মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে মরিয়া থাকলেও এখন প্রাণের মায়ায় নির্বাচনী মাঠ থেকে নীরব প্রস্থানের পথ খুঁজছেন।
যশোর সদর উপজেলার উপশহর ইউনিয়নে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রেজাউল ইসলাম কামাল যায়যায়দিনকে বলেন, এ ইউনিয়ন বিএনপির ঘাঁটি। প্রতিবার এখান থেকে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীই বিজয়ী হন। কিন্তু এবার ক্ষমতাসীনরা বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঠেই নামতে দেয়নি। হামলা-হুমকিতে ভোটের সেই উৎসবমুখর পরিবেশ নেই। তাই স্বাভাবিকভাবেই ভোটাররা পিছুটান দিয়েছেন। একই কারণে তারাও নির্বাচনে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
যশোর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন জানান, বিএনপি নেতাকর্মীদের ইউপি নির্বাচনের মাঠেই নামতে দেয়া হয়নি। হামলা-মামলা, মারপিট-হুমকিতে নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষও আতঙ্কগ্রস্ত। তৃণমূলের এই নির্বাচন সবসময় উৎসবমুখর পরিবেশে হলেও এবার তার লেশমাত্র নেই। ফলে শুধু বিএনপি নেতাকর্মীই নয়, সাধারণ মানুষও এ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলার বনগ্রাম, লোহাজুরী ও মসুয়াসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা জানান, দল থেকে মনোনয়ন পাওয়া প্রায় সব প্রার্থীর নামেই একাধিক রাজনৈতিক মামলা রয়েছে। এছাড়া প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেয়ার পরও অনেকের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দেয়া হয়েছে। তাই অনেকে আত্মগোপনে থেকে নির্বাচনী কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের ইঙ্গিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন পরিবারের অন্যান্য সদস্যের ওপর চড়াও হওয়ায় তাদের অনেকে এখন নির্বাচন থেকে পিছুটান দিয়েছেন।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও ভেড়ামারা এবং কুড়িগ্রামের চিলমারী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বিএনপি মনোনীত প্রায় এক ডজন প্রার্থী জানান, প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগে তাদের কাছ থেকে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি যে কোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনী মাঠ না ছাড়ার প্রতিশ্রুতি নেয়া হয়। ওই সময় তারা এসব শর্ত মেনে দলীয় মনোনয়ন নিলেও এখন তা বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই শ্যামকূল দুই-ই রাখতে তারা কোনো রকম গা বাঁচিয়ে নির্বাচনী মাঠে টিকে রয়েছেন। তবে শেষ সময়ে এভাবেও থাকতে পারবেন কিনা তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
তৃণমূল সূত্রগুলো জানায়, তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে বিএনপি দলীয় প্রার্থীরা সবাই এখন ৩১ মার্চের ভোটের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। ওই দিনের পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে তারা নির্বাচনী মাঠে সোচ্চার থাকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।
এদিকে ইউপি নির্বাচনে বিএনপি দলীয় প্রার্থীদের পিছুটানে রাজনীতিতে নতুন সঙ্কট তৈরি হবে বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের ভাষ্য, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মূলত বিএনপিই ভোটের মাঠে রয়েছে। কোনো কারণে তারা সরে গেলে ভোটাররাও ভোটকেন্দ্র বিমুখ হয়ে উঠবে। আর এ পরিবেশের নির্বাচনে বিজিত প্রার্থী স্থানীয়দের গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। যা আওয়ামী লীগের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বিএনপি যে কারণেই ভোটের মাঠ থেকে সরে যাক না কেন এর দায় কমিশনের ঘাড়েই বর্তাবে। এতে স্বাধীন এ প্রতিষ্ঠানটির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা পুরোপুরি লোপ পাবে। এ ধরনের একতরফা নির্বাচন দেশের চলমান রাজনৈতিক শূন্যতা আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে বলেও আশঙ্কা করেন তারা।
ইউনিয়ন পরিষদের দুই ধাপের নির্বাচন কেমন হয়েছে এ প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রাক-নির্বাচনের সময় সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা ছিল, যে শঙ্কা আরো গভীর হয়েছিল বিভিন্ন পদে প্রায় দেড়শ প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পর। অবশেষে এসব শঙ্কা যে বাস্তবে পরিণত হয়েছে তাতে এখন আর সন্দেহ নেই।
অভিজ্ঞ এই নির্বাচন পর্যবেক্ষকের ভাষ্য, নির্বাচন কেমন হয়েছে বা নির্বাচনের শুদ্ধতার পরিমাপ করতে হলে বেশ কয়েকটি বিষয় মানদ- হিসেবে কাজ করে থাকে। এসব মানদ-ই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এর মধ্যে মোটাদাগে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো হলো নির্বাচনে সব দল বা প্রার্থীর অংশগ্রহণের সুযোগ, অবাধ প্রচারণার পরিবেশ, পক্ষপাতহীন প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলার ব্যবস্থাপনা, বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা, নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা, ভোট গণনা এবং সর্বোপরি ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। এ মানদ-ের আলোকে বিশ্লেষণ করলেই দুই ধাপের নির্বাচন কতখানি সুষ্ঠু হয়েছে তার প্রমাণ মিলবে বলে মনে করেন তিনি।
নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় এ ধরনের ধস গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য সুখকর হবে না বলে মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের একজন শিক্ষক বলেন, দুই ধাপের নির্বাচনে সকাল থেকেই গণমাধ্যমে সেসব ছবি, ভিডিও ও রিপোর্ট এসেছে তাতে আগামী ধাপের ভোটে বিএনপি আগ্রহ হারাবে এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে ইসির পক্ষপাতমূলক আচরণ জনগণকে হতাশ করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নির্বাচন পর্যবেক্ষক বলেন, ‘দুই ধাপের ইউপি নির্বাচনে যা হয়েছে গণমাধ্যমে সেটা সবাই দেখেছে। ভোটের ফল যা-ই হোক না কেন এবারের নির্বাচনে যা ঘটেছে তা গণতন্ত্রের জন্য, সরকারের জন্য, মানুষের জন্য, নির্বাচন কমিশনের জন্য অর্থাৎ কারো জন্যেই ভালো হয়নি।’ এই নির্বাচনকে নিয়ে সবাই খুব আশাবাদী ছিল। কিন্তু যা হয়েছে তাতে প্রচ- হতাশ হতে হয়েছে- যোগ করেন তিনি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই রকম আরো জনপ্রিয় সংবাদ
© All rights reserved © 2017 Cninews24.Com
Design & Development BY Hostitbd.Com