,
প্রচ্ছদ | জাতীয় | আন্তর্জাতিক | সারাদেশ | রাজনীতি | বিনোদন | খেলাধুলা | ফিচার | অপরাধ | অর্থনীতি | ধর্ম | তথ্য প্রযুক্তি | লাইফ স্টাইল | শিক্ষাঙ্গন | স্বাস্থ্য | নারী ও শিশু | সাক্ষাতকার

নিক্সনকে ভর্ত্সনা করলেন বাঙালিপ্রধান নিলেন অসম্ভবকে সম্ভব করার মিশন

সিএনআই নিউজ : আজকের প্রজন্ম ডন টেটকে চেনে না। কারণ যেসব পত্রিকার প্রথম পাতায় একসময় নিয়মিত ছাপা হতো তাঁর বাইলাইন খবর তার বেশির ভাগই আজ বন্ধ হয়ে গেছে। স্ক্রিপস-হাওয়ার্ড গ্রুপের তারকা সাংবাদিক ছিলেন টেট। গ্রুপের হয়ে সাত বছর কাভার করেছেন ভিয়েতনাম। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা থেকে উত্তর-পূর্ব এশিয়া যেখানেই যুদ্ধ, সেখানেই টেট। এটা ছিল সেই যুগ, যখন যুদ্ধক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রতিটি পদক্ষেপ আজকের মতো মিলিটারি নজরদারিতে থাকত না। মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি প্রেসকার্ড নিয়ে যাওয়া যেত প্রায় সর্বত্র। আর এই সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করেন টেট। এর জন্য অবশ্য জানের ওপর দিয়ে কম ঝড় যায়নি। যুদ্ধ সাংবাদিকতার জন্য পেয়েছেন আর্নি পাইল স্মারক পুরস্কার। তাঁর লেখা বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্রেভো বার্নিং

মুক্তিযুদ্ধে মার্কিন ভূমিকা, ভারত, পাকিস্তান সম্পর্কে মনোভাব—ডন টেটের সঙ্গে এই আলাপচারিতায় অনেকটা রাখঢাক ছাড়াই এসব বিষয়ে কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানি শাসক, সামরিক বাহিনী সম্পর্কে উগরে দিয়েছেন নিজের ক্ষোভ

ঢাকা, বাংলাদেশ—প্রধানমন্ত্রী মুজিবুর রহমান আজ নিক্সন প্রশাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় নোংরা খেলার অভিযোগ এনেছেন। সম্ভাব্য মার্কিন সাহায্য গ্রহণের ব্যাপারেও তিনি শক্ত অবস্থান দেখিয়েছেন।

একান্ত এক সাক্ষাত্কারে, যার মধ্যে দুবার চোখে পানি আসার মতো আবেগ প্রদর্শন করার জন্য তিনি ক্ষমা চেয়ে নেন, মাত্র দুই সপ্তাহ আগে পশ্চিম পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে ফেরা প্রধানমন্ত্রী স্ক্রিপস-হাওয়ার্ড নিউজপেপারসকে জানান :

মার্কিন জনগণ তাঁর প্রতি সহমর্মী, এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত; কিন্তু অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে নিরীহ মানুষ নিধনে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে সহায়তার নোংরা খেলায় কেন নিক্সন প্রশাসন সাহায্য করল, এটা তিনি বুঝতে পারেন না।

বেসরকারিভাবে আসা মার্কিন সাহায্যকে তিনি স্বাগত জানান; কিন্তু মার্কিন সরকারের সাহায্য তিনি চান না—‘কিভাবে আমি এটা নিই?’ পরে অবশ্য তিনি এই বলে নরম হন যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে তিনি মার্কিন সাহায্য গ্রহণ করবেন।

একটি জাতিকে গড়ে তোলার প্রায় অসম্ভব এক কাজ তাঁর সামনে আর তিনি তা অর্জন করে ছাড়বেন।

‘মার্কিন জনগণ তো আমার বিরুদ্ধে না’—তিনি বললেন। ‘মার্কিন জনগণ আমার প্রতি পুরোপুরি সহমর্মী।

‘আমরা কী জন্য লড়াই করছিলাম? পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিপীড়ন-নির্যাতন থেকে আমার জনগণকে বাঁচাতে।

‘মার্কিন সরকার জানত না? এখানে মার্কিন সরকারের মিশনারি আছে। এখানে মার্কিন সরকারের তথ্য শাখা আছে। মার্কিন সরকারের একটা কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা [এজেন্সি] শাখা আছে। বাংলাদেশে কী ঘটছে, এর প্রতিটি খবর মার্কিন সরকার পেয়েছে।

মার্কিন নীতি

‘মার্কিন সাংবাদিকরা লিখে গেছেন, সিনেটররা প্রতিবাদ করে গেছেন। [সিনেটর এডোয়ার্ড এম] কেনেডি এখানে এসে প্রতিবাদ করে গেছেন। প্রশাসন কেন আমাদের বিরুদ্ধে ছিল? এটা ভিয়েতনাম না। আমরা তো আর মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে লড়ছিলাম না…

‘প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কি প্রতিবাদ করা উচিত ছিল না? দেশ তো আর নাড়াচাড়ার দাবার ঘুঁটি না, দেশ মানুষ, রক্তাক্ত মানুষ।

‘আমার দেশে রাস্তায় পর্যন্ত কেউ বেরোতে পারত না। কোনো মেয়ে রাস্তায় বেরোলে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হতো। বড় ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, যে কেউ-ই হোক, গুলি, গুলি, গুলি। মায়ের সামনে মেয়েদের ধর্ষণ করা হয়েছে, ছেলের সামনে মায়েদের ধর্ষণ করা হয়েছে…

“‘জয় বাংলা’ বলায় আমার বাড়িতে দুই বছরের একটা নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করে তার মাথায় পাকিস্তানি পতাকা পুঁতে দেওয়া হয়েছে। চোখ উপড়ে ফেলে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞকে তারা হত্যা করেছে, হূিপণ্ড বের করে তারা হূদেরাগ বিশেষজ্ঞকে হত্যা করেছে।

‘চিড়িয়াখানার প্রাণীগুলোকে পর্যন্ত তারা হত্যা করেছে। নািসরা কি এদের চেয়েও খারাপ? চেঙ্গিস খান কি [এর চেয়েও খারাপ]? মানবেতিহাসে এমন কাণ্ড আর শুনেছেন?”

ভারতকে সাহায্য বিষয়ে

মার্কিন সাহায্য বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, ‘মার্কিন সরকার ভারতকে সাহায্য দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কী জন্য? কারণ ভারত আমার স্বাধীনতা আন্দোলনে সাহায্য করেছে।’

‘সবার আগে অবশ্যই তাদের [নিক্সন প্রশাসন] এখন ভারতের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাদের অবশ্যই বলতে হবে যে তারা দুঃখিত। কারণ আমাদের জন্য ভারত ভুগেছে। মিসেস [ইন্দিরা] গান্ধী আমাদের জন্য কষ্ট স্বীকার করেছেন। বন্ধুভাবাপন্ন দেশ হিসেবে আমরা তাদের পাশে আছি।’

‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমার সহূদয় কৃতজ্ঞতা। তিনি মহীয়সী নারী। আমার এক কোটি লোক দেশান্তরিত হয়েছিল, তিনি তাদের খাদ্য, আশ্রয়সহ অন্য সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। এটা কি একটা মহান ব্যাপার না? এটা কি আমি ভুলতে পারি?’

সরাসরি সাহায্যের প্রস্তাব নিয়ে আদৌ মার্কিন সরকার যদি তাঁর কাছে আসে, এই জিজ্ঞাসার জবাবে প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘না, আমি তা চাই না’—তারপর নরম হয়ে বললেন, ‘কিভাবে এটা আমি গ্রহণ করি? প্রথমে অবশ্যই তারা ভারতকে দিক…তবে মার্কিন জনগণ আমাকে সাহায্য করছে। তারা নাগরিক কমিটি করেছে। তারা ডলার সংগ্রহ করছে। সিনেটর কেনেডি ও অন্যরা সাহায্য সংগ্রহ করছেন। সেটা আমি নেব।’

সাহায্যের শর্ত

মার্কিন সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে আনুষ্ঠানিক সাহায্য গ্রহণ করবেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাহলে ঠিক আছে।’

আসন্ন কাজ বিষয়ে তিনি বলেন, এত সামান্য নিয়ে এত কিছু করার ভার আরো কারো ওপরে বর্তেছে বলে তাঁর মনে হয় না—‘আমরা শূন্য থেকে শুরু করছি। তবে আমার জনগণ আমাকে ভালোবাসে আর আমি তাদের ভালোবাসি। তারা অপেক্ষা করবে। তারা কষ্ট সহ্য করবে তবু তারা আমার পাশে থাকবে…’

জনগণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিষয়ে যখন বলছিলেন, তখনই শেখ মুজিবের ক্ষমতা যেন পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হলো। ভরাটগলা অভিনেতার ক্ষমতাসম্পন্ন তাঁর কণ্ঠস্বর, আধা দক্ষিণী যাজক, আধা চার্লস বয়ার, আবেগে রীতিমতো কাঁপতে লাগল—‘আন্তরিকতার সঙ্গে অন্তরের অন্তস্তল থেকে যদি তুমি কথা বলো লোকে বুঝবে…তারা জানে, প্রধানমন্ত্রিত্ব, সম্মান, কিছুই আমার মাথা কিনতে পারবে না।’

আমি নীতিনিষ্ঠ লোক। জীবনভর তাদের জন্য লড়েছি আর তারা এটা জানে। তারা জানে আর কোনো বিকল্প নেই বলেই আমাকে প্রধানমন্ত্রী হতে হয়েছে।

‘আমি প্রধানমন্ত্রী হতে চাইনি। কারণ আমি তো জাতির পিতা। জাতির পিতার প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত না। প্রধানমন্ত্রী অসুবিধায় পড়তে পারে, বাস্তব অসুবিধা। কিন্তু আমাদের বিকল্প ছিল না।’

তিনি জানালেন, প্রায়োগিক দিক থেকে তাঁর জনগণ নিঃস্ব। তবে সাহায্য আসছে আর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নিয়ন্ত্রণে আছে।

তিনি জানালেন, সংখ্যালঘু চরমপন্থী বাদে আর সবার ওপর তাঁর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নাতীত। এবং তাঁর অনুরোধমতো মুক্তিবাহিনী গেরিলারা অস্ত্রসমর্পণ করা শুরু করেছে।

খাদ্য পরিস্থিতি বিষয়ে জানালেন, শিগগিরই অবস্থা খারাপ হতে পারে। তবে তিনি দৃঢ আস্থার সঙ্গে জানালেন, একবার খালি ভারতের সঙ্গে যৌথ বন্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিটা হয়ে গেলে কয়েক বছরের মধ্যেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব—‘বন্যাটা যদি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তাহলে আমাদের সমৃদ্ধ উর্বর মাটিতে এত খাদ্য উত্পাদন করতে পারব যে বাইরের খাবার আর আমাদের দরকার হবে না।’

পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ

পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক বিষয়ে [জানতে চাইলে] শেখ মুজিব এমন জোরে গর্জে উঠলেন যে তাঁর চা ছলকে পড়ার উপক্রম হলো : ‘চিরতরে খতম! এটা শেষ। আমরা তাদের সঙ্গে আর কিছুই করতে চাই না। সভ্যভব্য লোকের সঙ্গে আপনি থাকতে পারেন, কিন্তু বর্বর লোকের সঙ্গে তো আপনি থাকতে পারেন না।’

তিনি জানতে চান, তারা যা করেছে, মুসলমান হয়ে অন্য মুসলমানের ওপর এটা কিভাবে করে?

মুজিব বললেন, ‘যে মানুষ না, সে মুসলমানও হতে পারে না। তাদের সৈন্যরা মানুষ না। তারা কী করে মুসলমান হয়?’

সমাজতন্ত্র বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর দেশ মুজিববাদের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র অর্জন করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রয়োগের মাধ্যমে এটা বিকশিত হবে। গণতন্ত্রের ওপর বারবার জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যা কিছুই করি, সর্বদা এটাই [গণতন্ত্র] হবে আমাদের পথপ্রদর্শিকা শব্দ। অন্য পথ আমরা যথেষ্ট দেখেছি।’

Leave a Reply

VIDEO_EDITING_AD_CNI_NEWS
প্রধান সম্পাদক : তোফায়েল হোসেন তোফাসানি
বার্তা সম্পাদক : রোমানা রুমি, ৫৭, সুলতান মার্কেট (তয় তলা), দক্ষিনখান, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন ও ফ্যাক্স : ০২-৭৭৪১৯৭১, মোবাইল ফোন : ০১৭১১০৭০৯৩১
ই-মেইল : cninewsdesk24@gmail.com, cninews10@gmail.com
আঞ্চলিক অফিস : সি-১১/১৪, আমতলা মোড়, ছায়াবিথি, সোবহানবাগ, সাভার, ঢাকা।
Design & Developed BY PopularITLimited