,
প্রচ্ছদ | জাতীয় | আন্তর্জাতিক | সারাদেশ | রাজনীতি | বিনোদন | খেলাধুলা | ফিচার | অপরাধ | অর্থনীতি | ধর্ম | তথ্য প্রযুক্তি | লাইফ স্টাইল | শিক্ষাঙ্গন | স্বাস্থ্য | নারী ও শিশু | সাক্ষাতকার

শেখ মুজিব যেভাবে বঙ্গবন্ধু

সিএনআই নিউজ : আমাদের বাঙালি জাতি-রাষ্ট্রের স্রষ্টা ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। আমার সৌভাগ্য তাঁকে দেখেছি। তাঁর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পেয়েছি, কথা বলেছি, সমালোচনামূলক প্রশ্ন করেছি—উত্তর শুনেছি।

বাঙালিদের মধ্যে সাধারণত দেখা যায় না এমন শালপ্রাংশু দেহকান্তি, অনিন্দ্যসুন্দর মুখাবয়ব, ব্যক্তিত্বের প্রবলতা আর জলদগম্ভীরযেকোনো মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট ও মোহাবিষ্ট করে ফেলত। আর তাঁর বাগ্মিতা! সে এক বিস্ময়কর মাদকতায় ভরা বিস্ফোরক শব্দাবলির শিল্পিত অনুরণন (Resonance) ওজস্বিতা, আবেগ, যুক্তি আর তাঁর বলার ধরনের আকর্ষণীয় হৃদ্যতায় তাঁর বক্তৃতা হয়ে উঠত জনচিত্তহারী এক নিপুণ শিল্প। ১৯৭১ সালে বিশ্ববিখ্যাত নিউজউইক সাপ্তাহিক সাময়িকী তাঁকে যে ‘রাজনীতির কবি’ (Poet of Politics) আখ্যায়িত করেছিল তা তাঁর বক্তৃতায় ওই সব সৌন্দর্যভরা মোহনীয় শিল্পগুণের জন্যই।

বঙ্গবন্ধুকে বলা হয় ‘ক্যারিসমেটিক লিডার’ (Charismatic Leader), অর্থাৎ তাঁর চরিত্রে ক্যারিসমা-গুণ যুক্ত হয়েছে। ক্যারিসমা কী? ‘ক্যারিসমা’ হলো ‘সম্মোহনী’ শক্তি। যে নেতার শক্তিশালী, আকর্ষণীয় ও অনন্য ব্যক্তিগত গুণাবলি অন্যকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে, তিনিই ক্যারিসমেটিক লিডার। বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক জীবনে এই গুণাবলি অর্জন করেই হয়ে উঠেছিলেন দুঃখ-দৈন্যপীড়িত, দুর্দশাগ্রস্ত ও উপেক্ষিত-বঞ্চিত বাঙালির মহান জাতীয়তাবাদী নেতা এবং বাঙালির শত-সহস্র বছরের স্বাধীন রাষ্ট্র কামনার স্বপ্ন বাস্তবায়নের মহান রূপকার। তাই তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি ও স্রষ্টা এবং রাষ্ট্রনৈতিক অর্থে রাষ্ট্রপিতা (Founding Father of Bangladesh State)। আর এই অনন্য কীর্তির জন্যই তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক Cyril Dunn বলেন : ‘In the thousand year history of Bengal, Sheikh Mujib is her only Leader who has, in terms of blood, race language, culture and birth, been a full blooded Bengali. His physical stature was immense. His voice was redolent of thounder. His charisma worked magic on people. The courage and charm that flowed from him made him an unique superman in these times.’

দুই

শেখ মুজিব কেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক (Statesman)? কেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি? কেন তিনি বাঙালি জাতির পিতা? এসব প্রশ্নে কারো কারো সংশয় থাকতে পারে, থাকতে পারে ভিন্নমত; কিন্তু ইতিহাস ও রাষ্ট্র-দর্শনের তাত্ত্বিক বিচারে এর যথাযথ উত্তর পাওয়া কঠিন নয়। কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষ শত-সহস্র বছরে নানা উপাদান, জীবনযাপনের ধরন, খাদ্যাভ্যাস, রীতি-নীতি, সংস্কার এবং মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা তথা শিল্প-সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রের প্রতিভাবানের তাৎপর্যপূর্ণ অবদানে ধীরে ধীরে একটি জাতি হিসেবে বিকশিত হয়ে ওঠে; এবং কোনো একটা যুগে সেই জাতি তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক ও রাষ্ট্রসত্তাগত চেতনার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে। দেশের সর্বস্তরের ব্যাপক বিপুল মানুষের মনে এই সর্বোচ্চ চেতনার স্তর সৃষ্টিতে যে নেতার প্রধান ভূমিকা থাকে এবং সে ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত হয়ে যখন তা একটা যুগ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, তখনই কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীর মাহেন্দ্রক্ষণ। বাঙালি জাতির জীবনে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ। আর তাঁরই জীবনব্যাপী একনিষ্ঠ সাধনায় সৃষ্ট সেই চূড়ার ওপর দাঁড়িয়ে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা করেন : ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

বাঙালি হাজার বছর ধরে এই ঘোষণার অপেক্ষায় ছিল। এ জন্যই শেখ মুজিব হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। কারণ তিনি বাঙালির হাজার বছরের স্বপ্নের এবং অন্তরের অন্তস্তলে গুমরে মরা স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন সেদিন। যুগের দাবিকে সাহসে, শৌর্যে ও দার্ঢ্যে ভাষা দিয়েছিলেন তিনি দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর কামান, বন্দুক ও হেলিকপ্টার গানশিপের যেকোনো মুহূর্তে গর্জে ওঠার ভয়াল পরিস্থিতির মুখে। পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোনো নেতা এমন ভয়ংকর জটিল পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে এত অকুতোভয়ে স্বাধীনতার কথা উচ্চারণের সাহস করেননি। এই নজিরবিহীন ঘটনার জন্যই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা, নিজস্ব রাষ্ট্রসত্তাগত বাঙালি জাতির জনক এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্রষ্টা।

তাঁর চেয়ে প্রতিভাবান ও বহু গুণে গুণান্বিত বাঙালি অনেকেই ছিলেন; তবু যে তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও আধুনিক রাষ্ট্রসত্তার অধিকারী বাঙালি জাতির জনক, তার কারণ :

এক : তিনি হাজার বছরের বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে জীবনব্যাপী একনিষ্ঠ সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, কারাযন্ত্রণা ভোগ করেই বাস্তবরূপ দিয়ে গেছেন। শিল্প বলুন, সাহিত্য বলুন, বিজ্ঞান বলুন বা রাজনীতি, প্রযুুক্তি যা-ই বলুন—কোনো কিছুই স্বাধীনতার চেয়ে বড় নয়। অতএব, ওই সব বিষয়ে সিদ্ধিলাভ, আর এক অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ প্রতিম পশ্চাদ্ভূমির (Hinterland) অসংগঠিত জনগোষ্ঠীকে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যে সময়োপযোগী মোক্ষম কর্মসূচির মাধ্যমে ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে ঐক্যবদ্ধ মরণপণ স্বাধীনতাকামী জাতিকে উন্নীত করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আধুনিক মারণাস্ত্রসমৃদ্ধ দখলদার বাহিনীর কবজা থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনে দেওয়া তুল্যমূল্য বিবেচিত হতে পারে না;

দুই : বঙ্গবন্ধুর অতুলনীয় কৃতিত্ব এখানে যে তিনি বাংলাদেশে চারটি ধর্মে বিভক্ত অসম ও অসমন্বিত উপাদানে গঠিত বাঙালি জাতির এবং প্রায় উনপঞ্চাশটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তাকে একই জাতিরাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনে অটুট ঐক্যে গ্রথিত করে দক্ষিণ এশিয়ায় এক অনন্য ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক ও সমাজতন্ত্রাভিসারী রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হন। এ রকম সাফল্য নজিরবিহীন;

তিন : আর কোনো বাঙালি এমন করে বলেননি : ‘ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময়েও বলবো আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ 

চার : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্রষ্টা এবং নবরাজনৈতিক বাঙালি জাতির পিতা তার তাত্ত্বিক ভিত্তির জন্য আমরা এই বিষয়ের শ্রেষ্ঠ ভাবুক জার্মান দার্শনিক হেগেলের শরণ নিতে পারি। হেগেল বলেন : ‘Man owes his entire existence to the state and has his being within it alone.’

 তিনি আরো বলেন : ‘The Great man of the age is one who can put into words the will of his age, tell his age, what its will is, and accomplish it. What he does is the heart and essence of his age, he actualies his age’ (Philosophy of Right গ্রন্থ)। শেখ মুজিব তাঁর যুগের ইচ্ছা ও এষণাকে (Will of his age) বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন (actualize his age)। তাই তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি ও বাঙালি জাতির জনক।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে কয়েক শ বছরে যে বাঙালি জাতি গড়ে ওঠে তা ছিল প্রথমে একটি নৃগোষ্ঠী (জধপব) মাত্র। একই ভাষা ও সাধারণ আর্থ-সামাজিক জীবনধারার বিকাশের ফলে এবং শারীরিক, মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক গড়নের সাযুজ্যে এই নৃগোষ্ঠী স্বকীয় বৈশিষ্ট্য এবং বহু ক্ষেত্রের নানা মনীষীর নিজ নিজ ক্ষেত্রে চিন্তার নব নব বিন্যাসে একটি উন্নত জনগোষ্ঠীতে (Community) পরিণত হয়। প্রায় তিন দশকের স্বাধিকার ও সুপরিকল্পিত স্বাধীনতা আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর তা একটি রাষ্ট্রনৈতিক জাতিতে পরিণত হয়েছে। এর জন্য বাঙালি তরুণরা আত্মাহুতি দিয়েছে, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনুশীলনের মাধ্যমে গড়ে তুলেছে বাঙালি জাতিসত্তা ও ঐক্যবদ্ধ জাতি। এ জাতিরই মূল স্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ জাতি গঠনে নানা কাল পর্বে অবদান রাখেন চর্যাপদের সিদ্ধসাধক, নাথ-যোগী, তান্ত্রিক, মধ্যযুগের কবি-সাহিত্যিক ভাবুক-চিন্তক, বাউল-বৈষ্ণব, কবিয়াল-বয়াতি ও লোকজ সংস্কৃতির গুণীজন এবং আধুনিককালের আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, চিত্তরঞ্জন দাশ, এ কে ফজলুল হক, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, মওলানা ভাসানী, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ব্যারিস্টার আবদুর রসুলসহ অনেকে। তবে ইতিহাসের গতিধারায় রাজনৈতিক উত্তুঙ্গ মুহূর্তের (Momentum)সৃষ্টি করে তাকে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় পরিণত করার কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর যোগ্য ডেপুটি তাজউদ্দীন আহমদ এবং অন্য দেশপ্রমিক রাজনীতিবিদদের।

পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের ২৩ বছরের স্বৈরাচারী, সামরিক জান্তার নানা ষড়যন্ত্র, কূট চক্রান্ত এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির বৈধ অধিকার অস্বীকার করে বাঙালির বিশাল সক্রিয় অসহযোগকে চিরতরে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী পূর্ব বাংলায় গণহত্যা শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানের কারাগারে আটক করে রাষ্ট্রদ্রোহের বিচার শুরু করে তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশে তাঁকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। সৈয়দ নজরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। বাংলাদেশের সব ধর্ম-সম্প্রদায় ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নবীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ। গোটা এশিয়া, বিশেষ করে ধর্মপ্রবণ ও শিক্ষা-দীক্ষাহীন দারিদ্র্যপীড়িত দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নজির ইতিহাসে বিরল। এদিকে লক্ষ রেখেই যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার তাত্ত্বিক অস্টিন ডেইসি (Austin Dacey) বলেছেন : ‘Thomas Jefferson could have learned a lot about secular democracy from Sheikh Mujibur Rahman’ (The Daily Star, March 17, 2006). শুধু গণতান্ত্রিক দেশের রাজনীতি বিশ্লেষকরাই নন, সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার কিংবদন্তি নায়ক ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন করেছেন এই ভাষায় : ‘I have not seen the Himalays, but I have seen Sheikh Mujib. In personality and in courage, this man is the Himalays. I have thus had the experience of witnessing the Himalays.’

Leave a Reply

VIDEO_EDITING_AD_CNI_NEWS
প্রধান সম্পাদক : তোফায়েল হোসেন তোফাসানি
বার্তা সম্পাদক : রোমানা রুমি, ৫৭, সুলতান মার্কেট (তয় তলা), দক্ষিনখান, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন ও ফ্যাক্স : ০২-৭৭৪১৯৭১, মোবাইল ফোন : ০১৭১১০৭০৯৩১
ই-মেইল : cninewsdesk24@gmail.com, cninews10@gmail.com
আঞ্চলিক অফিস : সি-১১/১৪, আমতলা মোড়, ছায়াবিথি, সোবহানবাগ, সাভার, ঢাকা।
Design & Developed BY PopularITLimited