,
প্রচ্ছদ | জাতীয় | আন্তর্জাতিক | সারাদেশ | রাজনীতি | বিনোদন | খেলাধুলা | ফিচার | অপরাধ | অর্থনীতি | ধর্ম | তথ্য প্রযুক্তি | লাইফ স্টাইল | শিক্ষাঙ্গন | স্বাস্থ্য | নারী ও শিশু | সাক্ষাতকার

বাংলার ঐতিহ্যবাহী তাঁতি

সিএনআই নিউজ : বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের ইতিহাস অতি প্রাচীন। যুগ যুগ ধরে এ পেশায় জড়িত আছেন তাঁতিরা। মাকুর ছন্দময় ঠুকুর ঠাকুর শব্দ তুলে একমনে কাজ করে যান তারা। কখনো তৈরি করেন জমকালো বেনারসি। কখনো নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় বের হয়ে আসে সূক্ষ্ম কাপড়ের ফালি। আবার কখনও প্রস্তুত করেন মোটা কাপড়ের গামছা কিংবা নিতান্তই সাধারণ লুঙ্গি। তুলা বা তুলা থেকে উৎপন্ন সুতা থেকে কাপড় বানানো তাঁত বিভিন্ন রকমের হতে পারে। খুব ছোট আকারের হাতে বহনযোগ্য তাঁত থেকে শুরু করে বিশাল আকৃতির স্থির তাঁত রয়েছে। আধুনিক বস্ত্র কারখানাগুলোতে স্বয়ংক্রিয় তাঁত ব্যবহার করা হয়। ‘তাঁত বোনা’ শব্দ দুটি এসেছে ‘তন্তু বয়ন’ থেকে। যারা তাঁত বোনেন তারাই তাঁতি। ঐতিহ্যবাহী এ পেশাটির ধারকরা তাদের মনের শৈল্পিক ভাবনা নিয়ে আসেন কাপড়ে।

গোড়ার কথা : দেশের সর্ববৃহৎ কুটিরশিল্প বা লোকশিল্প এটি। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছে এ দেশের সংস্কৃতি। তাঁতশিল্প গড়ে উঠেছিল আমাদের নিজস্ব বানানো তাঁতযন্ত্র এবং নিজেদের তুলা দিয়ে। দৈনন্দিন  ব্যবহার্য কাপড়ের চাহিদা পূরণের জন্যই তাঁতি সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিল। চর্যাপদে তাঁতিদের জীবনপ্রণালি, কাজের গতি-প্রকৃতি, তাদের পেশার শৈল্পিক উপস্থিতি ইত্যাদি বিষয়ে বলা হয়েছে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে স্নিগ্ধা, দুকুল, পাত্রনন্দা ইত্যাদি নামের কিছু মিহি সুতার উল্লেখ করা হয়। ঐতিহাসিক ও প্রত্নত্তত্ববিদদের আবিষ্কার থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালে বাংলা সুতিবস্ত্র উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ছিল। বাংলায় বস্ত্রশিল্পের সস্তা উপকরণ তুলে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হতো। খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে ঢাকার মসলিন রোমে সুখ্যাতি ও বিপুল কদর লাভ করে। বাংলায় বিভিন্ন ধরনের মসলিন তৈরি হতো। এছাড়াও অন্যান্য মিহি সুতার কাপড়ও তৈরি হতো।
একসময় হিন্দু সম্প্রদায়ের কারিগররাই তাঁতি পেশায় আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ পর্যন্ত এই পেশার লোকজন আশ্বিনী তাঁতি নামে পরিচিত ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে আশ্বিনী বা আসান তাঁতিরা দাবি করেন তারাই আসল তাঁতি। অন্যরা হচ্ছে তাদের উপগোত্র। এ দলের তাঁতি মহিলারা নাকে নোলক পরতেন। এটি ছিল তাদের সামাজিক স্বাতন্ত্র্যের নিদর্শন।
তাঁতিরা উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত পেশার অনুসারী। তারা বিভিন্ন উপাধি, যেমন- বসাক, নন্দী, পাল, প্রামাণিক, সাধু, সরকার, শীল ইত্যাদি নামে পরিচিত। বসাক উপাধি এসেছে ধনাঢ্যদের কাছ থেকে। এরা বুনন কাজ করার মাধ্যমে কাপড় ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়েছে। ১৯২০-এর প্রথমার্ধে শহুরে তাঁতিদের থেকে ভিন্ন প্রকৃতির একদল তাঁতি পূর্ববঙ্গে এসে আবাস গড়েন। তাদেরই বাংলার আসল তাঁতি বংশোদ্ভূত বলে গণ্য করা হয়।
মুঘল আমলে হিন্দু ও মুসলিম উভয়েই এ পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৫১৮ সালের দিকে দুয়ার্তে বারবোসা নামের এক পর্তুগিজ পরিব্রাজক বাংলা ভ্রমণ করেছিলেন। তার লেখায় সে সময়ের বিশিষ্ট কিছু কাপড়, যেমন- মেমোনা, চওলারি, চিনিবাপা, বালিহা ইত্যাদিও কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন এবং কর্তৃত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেশীয়ভাবে উৎপাদিত কাপড়ের উন্নয়ন ও রফতানিকরণের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক হস্তক্ষেপ ঘটায়। ১৭৭৩ সালে মি. রোজ জানান, তাঁতিরা সাধারণত ভিরু প্রকৃতির ও অসহায়।
তবে প্রায় এক শতাব্দী আগে বাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরে বুনন মেশিন বা চরকা ছিল। স্বদেশি আন্দোলনের সময় যখন বিদেশি পণ্য বর্জন করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে জাতীয় কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছিলো তখন বিলেতি ব্যবসা বাণিজ্য প্রায় অচল হয়ে পড়ে। সে সময় তাঁতবস্ত্রের উন্নয়ন ঘটার একটি সুযোগ তৈরি হয়। ১৯৪৭ সালে বিলেতি শাসনের শেষদিকে ভারতে তাঁতশিল্পে ঝলমলে ফ্যাশনের পুনর্বিকাশ ঘটতে শুরু করে।
হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে তাঁতিদের দেখা পাওয়া যায়। মুসলমান তাঁতিদের বলা হতো জোলা। এই জোলা তাঁতিদের সংখ্যাধিক্য ছিল টাঙ্গাইল, কালিহাতী ও গোপালপুর এলাকায়। আবার যুগী বা যুঙ্গীদের নাথপন্থী এবং কৌলিক উপাধি হিসেবে দেবনাথ বলা হয়। মোটা কাপড় বোনার কাজে এদের একচেটিয়া অধিকার ছিল। যুগীরা গামছা, মশারি তৈরি করে প্রায় স্বাধীনভাবেই ব্যবসা চালাত।
আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় তাঁতশিল্প গড়ে উঠেছিল টাঙ্গাইল জেলায়। এছাড়া বৃহত্তর পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলায়ও এ শিল্প সমৃদ্ধি লাভ করে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিরাই হচ্ছে টাঙ্গাইলের আদি তাঁতি। এরা সিন্ধু অববাহিকা থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে এসে বস্ত্র বয়ন শুরু করেন। কিন্তু সেখানকার আবহাওয়ায় শাড়ির মান ভালো না হওয়ায় চলে আসেন রাজশাহী অঞ্চলে। সেখানেও আবহাওয়া অনেকাংশে প্রতিকূল দেখে বসাকরা দু’দলে ভাগ হয়ে একদল চলে আসে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর, অন্য দল ঢাকার ধামরাইয়ে। এদের একটি অংশ সিল্কের কাজে যুক্ত হয়ে রাজশাহীতেই থেকে যান। ধামরাইয়ে কাজ শুরু করতে না করতেই বসাকরা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে ভাগ হয়ে অনেক বসাক চলে যান প্রতিবেশী দেশের চোহাট্টা অঞ্চলে।
টাঙ্গাইলে বংশানুক্রমে যুগের পর যুগ তারা তাঁত বুনে আসছেন। এককালে টাঙ্গাইলে বেশিরভাগ এলাকাজুড়ে বসাকদের বসবাস ছিল, তারা বসাক সমিতির মাধ্যমে অনভিজ্ঞ তাঁতিদের প্রশিক্ষণ দান ও কাপড়ের মান নিয়ন্ত্রণ করতেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও  ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর অনেক বসাক তাঁতি ভারত চলে যান। এ সময় বসাক ছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তারা বসাক তাঁতিদের মতোই দক্ষ হয়ে ওঠেন। টাঙ্গাইল ছাড়াও দেশের কিছু অঞ্চল, যেমন নরসিংদী, ডেমরা, শাহজাদপুর, কুমারখালী, বাবুরহাট, গৌরনদী, রুহিতপুর এবং নাসিরনগর বয়নকার্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
কাপড়ের গুণগত বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ দেখা যায় অঞ্চলভিত্তিক কাপড় উৎপাদনে। রাজশাহীর সিল্ক, টাঙ্গাইল ও পাবনার সুতি শাড়ি, মিরপুরের কাতান এবং জামদানি, ডেমরার বেনারসি এবং নরসিংদীর লুঙ্গি, গামছার খ্যাতি রয়েছে দেশজুড়ে। এছাড়াও মণিপুরি, রাখাইনদের তাঁতের বোনা বিভিন্ন রঙ ও নকশার শাড়ি ও কাপড় বেশ নাম করেছে। তাঁতিরা বেশিরভাগই গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন এবং বর্তমানে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পুরোটাই বাণিজ্যকেন্দ্রিক। তারা গ্রামের যে অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন তাকে তাঁতিপাড়া বলে। 
আগেরকার দিনে হস্তচালিত তাঁতের সাহায্যে তাঁতবস্ত্র তৈরি করার জন্য চরকা বা সুতা কাটার টাকু ব্যবহার করা হতো।
তাঁতি নিপুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলেন যুগ যুগের ঐতিহ্য। যদিও তারা চিন্তিত নিজেদের অনিশ্চিত আগামী নিয়ে। তবুও সুতার রঙিন ফোঁড়ে বুনে চলেন স্বপ্নের জাল ও নিজের ভবিষ্যৎ। আর গেয়ে ওঠেন: ভাদর মাসে কাটিলাম সুতা/ আশ্বিন মাসের পয়লাতে/ বাড়ির কাছে তাঁতিয়া ভাইরে/ শাড়ি খান বুনে দে।/ সেই কথা শুনিয়ারে তাঁতি/ মনে মনে হাসতাছে/ কি-বা রঙের বুনবো শাড়ি/ ছবি খান দেখায়া দে…।

Leave a Reply

VIDEO_EDITING_AD_CNI_NEWS
প্রধান সম্পাদক : তোফায়েল হোসেন তোফাসানি
বার্তা সম্পাদক : রোমানা রুমি, ৫৭, সুলতান মার্কেট (তয় তলা), দক্ষিনখান, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন ও ফ্যাক্স : ০২-৭৭৪১৯৭১, মোবাইল ফোন : ০১৭১১০৭০৯৩১
ই-মেইল : cninewsdesk24@gmail.com, cninews10@gmail.com
আঞ্চলিক অফিস : সি-১১/১৪, আমতলা মোড়, ছায়াবিথি, সোবহানবাগ, সাভার, ঢাকা।
Design & Developed BY PopularITLimited