,
প্রচ্ছদ | জাতীয় | আন্তর্জাতিক | সারাদেশ | রাজনীতি | বিনোদন | খেলাধুলা | ফিচার | অপরাধ | অর্থনীতি | ধর্ম | তথ্য প্রযুক্তি | লাইফ স্টাইল | শিক্ষাঙ্গন | স্বাস্থ্য | নারী ও শিশু | সাক্ষাতকার

ঐতিহ্যের ঘোড়াকে জিম্মি করে চলছে বাণিজ্য

টি এম কামাল : সারা দেশের নগর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ, চর-ডাঙা সবখানেই ৪০০ বছরের
পুরনো নবাবি আমলের আদলে ঐতিহ্যের প্রাণী ঘোড়াকে জিম্মি করে চলছে রমরমা
বাণিজ্য। রাজধানী, বিভাগীয় নগরী, জেলা ও উপজেলা সদরে বাহারি সাজে সজ্জিত টমটম
আর গ্রামগঞ্জ-চরাঞ্চলের ধূধূ মাঠ আর দুর্গম উত্তপ্ত বালুচরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিতে নিতে
মানুষের জীবিকা জোগাতে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে চলছে ঐতিহ্যের
এই ঘোড়া। প্রাণিবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে প্রাণী অধিকার আইন বিঘিœত হচ্ছে।
সব প্রাণীর নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে সংসদে উত্থাপিত প্রাণী
কল্যাণ বিল-২০১৯ পাস ও তার মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন জরুরি বলেও মনে করেন তারা।
৪০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ নাগাদ মানুষ, ঘোড়া পোষা শুরু করে এবং ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে
তাদের বহুলভাবে পোষ মানানো শুরু হয়। ঘোড়ার উপজাতির মধ্যে ক্যাবালাসকে পোষ
মানানো হয়, যদিও এদের কিছু পোষ্য দল বুনো ঘোড়ার মতো খোলা জায়গায় বা জঙ্গলে
বাস করে। ঘোড়া বা ঘোটক দ্রুতগামী এ জন্য এর নাম তুরগ, তুরঙ্গম। বাংলাদেশ
প্রাণিসম্পদ বিভাগের আওতায় এটি আগে বন্যপ্রাণী হিসেবে থাকলেও পরে ঘোড়াকে
গৃহপালিত প্রাণীর মর্যাদা দেয়া হয়। ঘোড়ার গাড়ি একটি প্রাচীন যানবাহন। মূলত
এটি জমিদার ও রাজপরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করতেন। রণাঙ্গনের রসদ সরবরাহে ব্যবহার করা
হতো ঘোড়ার গাড়ি। যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়েছে যানবাহনেরও।
এখন আবারো আমাদের দেশে ফিরে এসেছে ঘোড়ার গাড়ি।
রাজধানী, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, খুলনাসহ বিভাগীয় নগরী
দেশের গ্রাম ও চরাঞ্চলে এখন ঘোড়ার গাড়ির অবাধ বিচরণ। নগর বন্দরের পিচঢালা, গ্রামের
মেঠোপথ আর চরাঞ্চলের ধূধূ বালুচরে ঝুঁকির মুখে গাড়িটানার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে
ঘোড়াগুলোকে। কারো জীবিকা এবং কারো আনন্দের খোরাক জোগাতে ছুটে চলে
ঘোড়া। এরই মধ্যে পথের সারথি ঘোড়ার পিঠে কোচওয়ানের চাবুকের আঘাত।
অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর ঘোড়াগুলোর ঠাঁই
মেলে নগরীর কোনো ফ্লাইওভারের নিচে, না হয় ডাস্টবিনের পাশে। আর গ্রামের অস্বাস্থ্যকর
পরিবেশে। অসুস্থ হলে চিকিৎসাও হয় না। মেলে না পর্যাপ্ত খাবারও। চর ও গ্রামের দুর্গম
রাস্তায় কম খরচে পণ্য পরিবহন-সুবিধার কারণেই বাড়ছে ঘোড়ার গাড়ির সংখ্যা।
সেইসাথে চাহিদা। ঘোড়ার গাড়িতে নদী-বিচ্ছিন্ন দুর্গম চরে পণ্য আনা-নেয়া
সাশ্রয়ী ও সুবিধাজনক বলে অনেক এলাকার কৃষক থেকে শুরু করে ছোট বড় ব্যবসায়ীরা
ঝুঁকছেন ঘোড়ার গাড়ির দিকেই।
সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে যমুনাবিধৌত নাটুয়ারপাড়া ইউনিয়নের ঘোড়াগাছা
গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, চরের দুর্গম বালুতে অটোরিকশা, সাইকেল,
মোটরসাইকেল কিছুই চলে না। ঘোড়ার গাড়িতে এখন ধান, পাট, গম, ভুট্টা ও
শাকসবজি সরাসরি বাজারে নিয়ে বিক্রি করছি। তাতে দাম ভালো পাচ্ছি। এতে খরচও কম
হয়। ফড়িয়া ব্যবসায়ী আর আমাদের ঠকাতে পারছে না। সে জন্য আমরা ঘোড়ার গাড়ি

ব্যবহার করি। একই গ্রামের চরের ঘোড়ার গাড়িচালক হবিবার রহমান জানান, লাখ টাকার
কমে আজকাল গরু বা মহিষের গাড়ি করা যায় না। তাই গরু-মহিষের গাড়ি কেনার
সঙ্গতি না থাকায় ধারকর্জ করে ৪৫ হাজার টাকায় ঘোড়ার গাড়ি কিনে জীবিকা
নির্বাহ করছি। মনসুরনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক রাজমহর জানিয়েছেন,
চরাঞ্চলে ঘোড়ার গাড়িতে স্বল্প খরচে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন করা যায়। এতে যাতায়াত ও
পণ্য আনা-নেয়ায় সাশ্রয়ের পাশাপাশি অনেক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ চরের ভুট্টাচাষি আব্দুল হাকিম জানান,
নদীতে পানি না থাকায় নৌকায় খুব ঝামেলা, তাই ঘোড়ার গাড়িই ভরসা। ঘোড়ার
গাড়িতে অনেক বেশি ভুট্টা পরিবহন করা যায় বলে ঝামেলাও কম। ক্ষেত থেকে যে সবজি
উত্তোলন করি তা কিনতে প্রতিদিন সকালে ঘোড়ারগাড়ি নিয়ে চরে হাজির হন
মহাজনরা। আর এখন ঘোড়ার গাড়ি থাকায় বাড়িতেও কৃষিপণ্য আনতে সমস্যা হয় না।
নাটুয়ারপাড়া চরের আসাদুল ইসলাম জানান, চরে উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিপণ্য আনা-
নেয়া করতে প্রতিদিন শতশত ঘোড়ার গাড়ি চরে আসে। পীরগাছা গ্রামের
ঘোড়াগাড়ি চালক বেলাল হোসেন জানান, মোটামুটি ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকায়
একটি মাঝারি ঘোড়া কেনা যায়। গাড়ি বানানো এবং অন্যান্য খরচসহ আরো ২০
হাজার টাকা খরচা হলেই ঘোড়ার গাড়ি হয়ে যায়। দৈনিক ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত
আয় করা যায়। তবে ঘোড়ার খাবার ও চিকিৎসায় অনেক খরচা হয়।
তেকানী ইউনিয়নের পানাগাড়ী গ্রামের ঘোড়াগাড়ি চালক আজগর আলী জানান,
এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চার বছর আগে নাটুয়ারপাড়া হাট থেকে ৩৫ হাজার টাকা
দিয়ে ঘোড়া কিনে ও ১০ হাজার টাকা খরচ করে গাড়ি তৈরি করি। এখন ওই গাড়ি দিয়ে
আয় করে কিস্তিও দিয়েছি। সংসারও ভালো চলছে। নিশ্চিন্তপুর ডিগ্রি দোরতা গ্রামের
ঘোড়ার গাড়িচালক আমিনুল ইসলাম জানান, চরের জমিতে প্রতি বছরই ব্যাপক ফসল হয়।
কিন্তু শ্রমিক দিয়ে এসব ফসল ঘরে আনা কষ্টকর। ধূধূ বালুচরে ফসলের বোঝা কাঁধে
নিয়ে কেউ হাঁটতে পারে না। এ কারণেই দিন দিন চরাঞ্চলে ঘোড়া কেনার প্রবণতা বেড়ে
গেছে। চরগিরিশ ইউনিয়নের চরনাটিপাড়ার মওসুমি ব্যবসায়ী আবুল হোসেন জানান,
চরে অন্য কোন বাহন দিয়ে পণ্য পরিবহন করা যায় না। সে কারণে ঘোড়ার গাড়িই এখানে
ভরসা। অন্য দিকে শৌখিন ঘোড়ার গাড়ি চালান আব্দুল হামিদ। তিনি জানান, সব সময়
সেভাবে ভাড়া পাওয়া যায় না। তবে বিভিন্ন দিবস এলে আমার ঘোড়ার গাড়ির কদর বেড়ে
যায়। বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাই। এভাবে সংসার চালাচ্ছি। অন্যান্য সময় গাড়ি
বদলিয়ে চরাঞ্চলে গিয়ে পণ্য পরিবহন করি। কাজিপুর সরকারি মনসুর আলী কলেজের
উপাধ্যাক্ষ রেজাউল করিম রাঙ্গা ও বঙ্গবন্ধু ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক জানান,
ঘোড়ার গাড়িতে উঠতে বেশ মজাই লাগে। বিভিন্ন দিবসে আমরা বন্ধু-বান্ধবরা মিলে
ঘোড়ার গাড়িতে উঠে শহর বেড়িয়ে আসি। সবাই মিলে মজা করি। এমন পরিস্থিতিতে
আধুনিক যুগে বন্যপ্রাণীকে লোকালয়ে জিম্মি করে অর্থ-উপার্জন এবং আনন্দ
উপভোগের বিরোধিতা করছেন প্রাণী অধিকার রক্ষাকর্মীরা।
কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রধান প্রফেসর মোকছেদুল
হাসান জানান, এই বন্য প্রাণীগুলো কেন নগরে-বন্দরে-গ্রামে গঞ্জে-চরে ডাঙায়
থাকবে। তারা কেন মানুষের ভার বইবে। তারা কেন পণ্য পরিবহন করবে। তারা চাহিদামতো
খাবার পায় না। অথচ চাবুকের নির্দয় আঘাতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের মনে ভয়
ঢুকিয়ে তাদেরকে দিয়ে মানুষ ও পণ্য পরিবহন করে অর্থ উপার্জন করা হচ্ছে। আনন্দ
উপভোগ করা হচ্ছে। প্রাণীর প্রতি এই নিষ্ঠুরতা বন্ধ করা উচিত। প্রাণিসম্পদ
অধিদফতরের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক এ কে এম নাজমুল হাসান বলেন, আগে ঘোড়া আমাদের
বিভাগে বন্য প্রাণী হিসেবে থাকলেও এখন তা গৃহপালিত প্রাণীর মর্যাদা পেয়েছে।

সে কারণে ঘোড়া দিয়ে পরিবহন পরিচালনা করা যায়। তবে ঘোড়া খুব সংবেদনশীল হওয়ায়
এটির ব্যবহার করতে হয় খুব সাবধানে। ঘোড়া দিয়ে গাড়ি পরিচালনার সময় যাতে
কোনোভাবেই প্রাণী সুরক্ষা আইনের ব্যত্যয় না ঘটে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রয়োজনে প্রাণিসম্পদ বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে নজরদারি
বাড়াতে হবে। তিনি দ্রুত প্রাণী কল্যাণ আইন-২০১৯ পাস ও তার বাস্তবায়নের দাবি
জানান।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু গত ১০ মার্চ প্রাণী কল্যাণ
বিল-২০১৯ সংসদে উত্থাপন করেন। পরে বিলটি ৪৫ দিনের মধ্যে পরীক্ষা করে সংসদে
প্রতিবেদন দেয়ার জন্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী
কমিটিতে পাঠানো হয়। ১৯২০ সালের পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিরোধ আইন বাতিল করে
নতুন এই আইন করার প্রস্তাব করা হয়েছে সংসদে। এই আইনে বিভিন্ন অপরাধের জন্য
ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদ-, ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দ- দেয়ার বিধান রাখার
প্রস্তাব করা হয়েছে।

Leave a Reply

VIDEO_EDITING_AD_CNI_NEWS
প্রধান সম্পাদক : তোফায়েল হোসেন তোফাসানি
বার্তা সম্পাদক : রোমানা রুমি, ৫৭, সুলতান মার্কেট (তয় তলা), দক্ষিনখান, উত্তরা, ঢাকা।
ফোন ও ফ্যাক্স : ০২-৭৭৪১৯৭১, মোবাইল ফোন : ০১৭১১০৭০৯৩১
ই-মেইল : cninewsdesk24@gmail.com, cninews10@gmail.com
আঞ্চলিক অফিস : সি-১১/১৪, আমতলা মোড়, ছায়াবিথি, সোবহানবাগ, সাভার, ঢাকা।
Design & Developed BY PopularITLimited