
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ফ্ল্যাট কেনায় আগ্রহ নেই ক্রেতাদের। এর কারণ খতিয়ে দেখতে বলেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ সম্পন্ন ও ফ্ল্যাটের দাম কমানোর সুপারিশও করেছে কমিটি। একই সঙ্গে রাজউকের ফ্ল্যাট কিনতে ক্রেতাদের আগ্রহী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বলা হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দবিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রাজউকের প্লটের বিষয়ে সাধারণ মানুষের যে আগ্রহ, ফ্ল্যাট কেনার বেলায় তা দেখা যাচ্ছে না। এর মূলে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি। সংসদীয় কমিটি ফ্ল্যাটের নির্মাণকাজ দ্রুততার সঙ্গে শেষ করার পাশাপাশি ফ্ল্যাট কেনায় সাধারণ মানুষের আগ্রহ তৈরিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলেছে। এ ক্ষেত্রে বাধাগুলো চিহ্নিত করে তা দ্রুত অপসারণ এবং প্রয়োজনে দাম পুনর্নির্ধারণের কথাও বলেছে সংসদীয় কমিটি। ক্রেতাদের আগ্রহ না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জিএম জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের টাইপ-এ-এর প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ায় গ্রাহক সংকটে পড়েছে রাজউক। তিনি বলেন, এর নির্মাণকাজ দেয়া হয়েছিল এনা প্রপার্টিজসহ চারটি প্রতিষ্ঠানকে। প্রথম এক বছরে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে তাদের চুক্তি বাতিল করা হয়। ওই ঘটনা জনগণের আস্থা নষ্ট করেছে। তবে এখন রাজউকের তত্ত্বাবধানে দেশের খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে নির্মাণকাজ করানো হচ্ছে। ১২টি ভবনের কাজ প্রায় শেষ। রাজউকের অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে ‘রোড শো’সহ বিভিন্ন প্রচারণামূলক কর্মসূচি হাতে নেয়া হবে বলেও জানান রাজউকের চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের যাত্রা শুরুর এক বছরের মাথায় নিু ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর আবাসন সংকট দূর করার লক্ষ্যে অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প হাতে নেয় রাজউক। এর অংশ হিসেবে রাজউক উত্তরা (তৃতীয় পর্ব) প্রকল্পের ১৮ নম্বর সেক্টরে ২২৩টি ১৬তলা ভবন (বেজমেন্টসহ) নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ২০১১ সালের ৪ অক্টোবর এ প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা (ডিপিপি) অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পের প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয় ৯ হাজার ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। তিন ক্যাটাগরিতে (এ, বি ও সি) ১৮ হাজার ৭৩২টি ফ্ল্যাট হবে। ‘এ’ ক্যাটাগরির ৭৯টি ভবনে ৬ হাজার ৬৩৬টি ফ্ল্যাট, ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ৭২টি ভবনে ৬ হাজার ৪৮টি এবং ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ৭২টি ভবনে ৬ হাজার ৪৮টি ফ্ল্যাট তৈরির পরিকল্পনা হয়। জানা গেছে, ‘এ’ ক্যাটাগরির প্রায় আড়াই হাজার ফ্ল্যাট এখনও অবিক্রীত। দফায় দফায় সময় বাড়িয়েও ফ্ল্যাট কেনায় মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারেনি রাজউক। ২০১৫ সালের মধ্যে ‘এ’ টাইপের অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও কবে তা শেষ হবে তা জানে না রাজউক। এ ছাড়া ‘বি’ এবং ‘সি’ টাইপের ফ্ল্যাট নির্মাণের লক্ষ্যে জি-টু-জি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে ২০১১ সালের ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। যদিও মালয়েশিয়ার মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে কিনা তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। কমিটির কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, প্রথম দফার বিজ্ঞপ্তিতে প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম নির্ধারণ করা হয় ৩ হাজার ৫শ’ টাকা। দ্বিতীয় দফার বিজ্ঞপ্তিতেও একই দাম রাখা হয়। তবে তৃতীয় দফার বিজ্ঞপ্তিতে (চলমান) ১ হাজার ৩শ’ টাকা বাড়িয়ে প্রতি বর্গফুট ৪ হাজার ৮শ’ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সংসদীয় কমিটি সাধারণ মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করতে প্রয়োজনে দাম কমানোরও সুপারিশ করেছে। তাদের মতে, যখন দাম কম ছিল তখনই অনেকে ফ্ল্যাট কেনায় আগ্রহ দেখায়নি। দাম বাড়ানোয় মানুষ কতটা আগ্রহ দেখাবে তা খতিয়ে দেখতে হবে। সংসদীয় কমিটি প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম কিছুটা কমানো যায় কিনা তা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউককে ভেবে দেখার সুপারিশ করে। তবে এর সঙ্গে একমত নয় রাজউক। তারা বলছে, বাজারদরের চেয়ে অনেক কম দামেই তারা ফ্ল্যাট বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রসঙ্গে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, রাজউক প্রকল্পের আশপাশে বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানির ফ্ল্যাট প্রতি বর্গফুট আট হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, বেসরকারি কোম্পানির চাইতে রাজউকের ফ্ল্যাটের প্রকল্পের লোকেশন অনেক ভালো। রয়েছে খোলামেলা জায়গা।
গুণগত মান অনুযায়ী দাম বেশি ধরা হয়নি, তাই দাম কমানোরও কোনো চিন্তা নেই। তবে প্রকল্প সম্পর্কে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়াতে প্রচারণামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধির কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রকল্প এলাকায় একটি রোড শো করার নির্দেশ দিয়েছি। এটি যথাযথভাবে করতে পারলে রাজউকের ফ্ল্যাট কিনতে গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়বে। আর প্রকল্প নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তাও কেটে যাবে। জানা গেছে, উত্তরার অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে টাইপ-এ ক্যাটাগরিতে ফ্ল্যাট বরাদ্দের জন্য প্রথম দফায় ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একাধিকবার রাজউক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। প্রাথমিক আবেদনের সময়সীমা ছিল ২০১২ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। ওই সময় ফ্ল্যাটের চেয়ে কম আবেদন জমা পড়ে। পরে ওই বছরের মার্চে কিছু শর্ত সংশোধন করে দ্বিতীয় দফায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে রাজউক। আবেদনের সময়সীমা ছিল ওই বছরের ৩০ জুলাই পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে ৬ হাজার ১১৬টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই করে রাজউক ১২তম বোর্ডসভায় ৬ হাজার ৬৮ জনকে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে রাজউকের ওয়েবসাইট ও জাতীয় দৈনিকে নির্বাচিতদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ফ্ল্যাট বরাদ্দপ্রাপ্তদের অনেকে টাকা উঠিয়ে নেন। সব মিলিয়ে এখন অবিক্রীত ফ্ল্যাটের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। এরপর গত বছরের ডিসেম্বরে ফের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে রাজউক। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত আবেদন করার সুযোগ ছিল। তবে সময় আরও বাড়ানো হতে পারে বলে রাজউক সূত্রে জানা গেছে। রাজউকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের কিস্তি পরিশোধ করা যাবে ১২ বছরে। প্রথম চার বছরে ৫০ ভাগ টাকা পরিশোধ করতে হবে। বাকি ৫০ ভাগ পরিশোধ করতে হবে পরবর্তী ৮ বছরে।