,
প্রচ্ছদ | জাতীয় | আন্তর্জাতিক | সারাদেশ | রাজনীতি | বিনোদন | খেলাধুলা | ফিচার | অপরাধ | অর্থনীতি | ধর্ম | তথ্য প্রযুক্তি | লাইফ স্টাইল | শিক্ষাঙ্গন | স্বাস্থ্য | নারী ও শিশু | সাক্ষাতকার

অ্যাক্রেডিটেশন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগের হাতিয়ার

world-acriditationমো. আবদুল জলিল : শিল্পায়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সময়ের ব্যবধানে শিল্পায়নের গতিধারা পরিবর্তন হয়েছে। শিল্পায়ন প্রক্রিয়ায় ক্রমেই আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। মানবসভ্যতার শুরুতেই শিল্পায়নের সূচনা হয়। মানুষ যখন গুহায় বসবাস করত, শিকারের জন্য পাথর দিয়ে তৈরি অস্ত্র ব্যবহার করত। পরবর্তীতে গুহার পাশে কৃষি আবাদের জন্য মাটি খোঁড়ার কাজে যে যন্ত্র ব্যবহার হতো, তাও শিল্প উৎপাদনেরই অংশ। মানবসভ্যতার বিকাশের পর ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রথম শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়। যোগাযোগের জন্য বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার, ছাপাখানা ও টেলিগ্রাফ মেশিনে স্টিম পাওয়ারের ব্যবহার, কয়লাভিত্তিক শক্তি উৎপাদন ইত্যাদির মাধ্যমে শিল্প বিপ্লব এগিয়ে যায়। শিল্প বিপ্লব বা বিকাশের ধারায় বর্তমান যুগে মানসম্পন্ন পণ্য ব্যবহার বা সেবা গ্রহণে ক্রেতা-ভোক্তার সস্তুষ্টি লাভে অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা কার্যকর অবদান রাখছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বিদ্যুৎ, টেলিফোন, রেডিও ও টেলিভিশন আবিষ্কার; সুলভ মূল্যে তেলের যোগান এবং জাতীয় পর্যায়ে যানবাহন চলাচলের জন্য অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে ওঠার মাধ্যমে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়। ধীরে ধীরে শিল্পায়ন প্রক্রিয়া আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে থাকে। এরপরই ইউরোপে তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়। এটি হলো ডিজিটাল কমিউনিকেশন ও ইন্টারনেটভিত্তিক একটি শিল্প বিপ্লব। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন ও বিপণনে পরিবেশবান্ধব সবুজ জ্বালানি ব্যবহার বৃদ্ধির প্রয়াস দেখা গেছে। উৎপাদিত পণ্য যাতে মানসম্মত হয় এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর না হয় সেদিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয়েছে।

২০১৮ সালে রাস্তায় চালকবিহীন গাড়ি নামবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২০ সালে চালকবিহীন গাড়ি বিশ্ব সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ ড্রাইভারচালিত গাড়ি রাস্তায় আর চলবেনা। রোবটিক টেকনোলজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ন্যানো-টেকনোলজি, বায়ো-টেকনোলজি ইত্যাদি প্রয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্পখাতে যে অসাধারণ পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে, সেটি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ছোঁয়া।

শিল্প বিপ্লবের পথ ধরে শিল্পোন্নত দেশগুলোর মতো স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো সৃজনশীল উদ্ভাবন ও মেধা বিকাশে বিনিয়োগ করলে এগিয়ে যাবে। তবে গবেষণা ও উন্নয়নখাতে বিনিয়োগের পরিমাণ সীমিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায়। বাংলাদেশের মানুষ দ্রুত এডাপটেশন (Adaptation) বা অভিযোজনের ক্ষমতা রাখে। যে কোনো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারি আমরা। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার, ফেসবুকিং ইত্যাদির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঈর্ষণীয় অগ্রগতির প্রবণতা এর বড়ো প্রমাণ।

প্রায় এক দশকে বাংলাদেশের শিল্পায়নে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দেশের শিল্পখাত খুব দ্রুতই প্রযুক্তিনির্ভর হতে চলেছে। শিল্পখাতে মেধা, সৃষ্টিশীলতা ও সৃজনশীল উদ্ভাবনের সমন্বয় ঘটছে। নতুন প্রজন্মের শিল্প উদ্যোক্তারা জ্ঞানভিত্তিক শিল্পায়নের অভিযাত্রায় দ্রুত শামিল হচ্ছেন। টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রযুক্তির প্রয়োগে উদ্যোক্তারা এগিয়ে এসেছেন। শিল্প ব্যবস্থাপনায়ও ব্যাপক গুণগত পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। শিল্পখাতে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান রপ্তানি আয় এবং রপ্তানিখাতে পণ্য বহুমুখীকরণের প্রভাব এখন দৃশ্যমান। এটি দেশের সামাজিক সূচকেও ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ অর্জনের স্বীকৃতি দিচ্ছে। জাতিসংঘের মূল্যায়নে সম্প্রতি বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক এ দেশকে নি¤œ-মধ্যম আয়ের রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এসব অর্জনের পেছনে শিল্পখাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

বৈশ্বিক শিল্পবিপ্লবের ধারা বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। শিল্পসমৃদ্ধ ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস এই শিল্প বিপ্লবেরই বাস্তবতা। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে। ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। এ অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে শুধু তৃতীয় শিল্প বিপ্লব নয়, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফলও কাজে লাগাতে হবে। উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের মাধ্যমে শিল্পখাতে ব্যাপকহারে গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে।

নিজেদের উৎপাদিত পণ্য যাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের যে কোনো কারিগরি কিংবা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে দাপটের সাথে টিকে থাকতে পারে, সে ধরনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে অ্যাক্রেডিটেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। একে বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

অ্যাক্রেডিটেশন কী, কীভাবে এটি শিল্পখাতে গুণগত পরিবর্তন আনে, শিল্প বিপ্লবের সুফল পেতে এর অবদান কী? খুব সহজে বললে, এটি হলো কোনো টেস্টিং বা পরীক্ষণ, ইন্সপেকশন বা পরিদর্শন এবং সার্টিফিকেশন বা সাক্ষ্যদান কার্যক্রমের তৃতীয় পক্ষীয় মূল্যায়ন দিয়ে কনফর্মিটি (Conformity)  বা সাযুজ্য নিরূপণ করা। যে কোনো পণ্য বা সেবা উৎপাদনের মূল উদ্দেশ্য হলো, ক্রেতা-ভোক্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সন্তুষ্টি অর্জন। ক্রেতাদের প্রত্যাশা হচ্ছে- নিরাপদ ও গুণগতমানের পণ্য বা সেবা। অন্যদিকে, পণ্য উৎপাদকরাও চান উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার কিংবা সেবা গ্রহণ করে ক্রেতা-ভোক্তারা সন্তুষ্ট থাকুক। আর অ্যাক্রেডিটেশন পদ্ধতি এ প্রত্যাশার প্রাপ্তি ঘটায়।

অ্যাক্রেডিটেশন পণ্য ও সেবার গুনগতমানের নিশ্চয়তা বিধান করে। পণ্যটি বিশ্বের যে কোনো দেশের একটি অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষিত হলে, তা বিশ্বের সকল দেশে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়। কোনো পণ্য একবার অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবরেটরিতে টেস্টেড বা পরীক্ষিত হলে, সেটি বার বার পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয় না।

নিরাপদ বিশ্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও অ্যাক্রেডিটেশনের ভূমিকা অনন্য। অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যা কিছু প্রয়োজন, তার সবই নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তৈরির নিশ্চয়তা প্রদান করে। এটি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত মান অনুসরণ নিশ্চিত করে, ফলে জননিরাপত্তা জোরদার হয়। সুষম ও দক্ষ বাজার ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের ধারা বেগবান হয়। তাই অ্যাক্রেডিটেশন ধারণা বিশ্বব্যাপী ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে।

অতীতে বাংলাদেশে কোনো অ্যাক্রেডিটেশন কর্তৃপক্ষ ছিল না। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (বিএবি) গঠিত হয়। বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন আইন, ২০০৬ এর অধীনে গঠিত বিএবি জনবল নিয়োগের মাধ্যমে ২০১০ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে বিএবি বাংলাদেশের একমাত্র অ্যাক্রেডিটেশন কর্তৃপক্ষ। জাতীয় অ্যাক্রেডিটেশন কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিএবি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নবীন।

তবে সরকারের সার্বিক সহযোগিতা এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে এটি দ্রুততার সাথে সকল শর্ত পূরণ করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। বিএবি এখন এশিয়া প্যাসিফিক ল্যাবরেটরি অ্যাক্রেডিটেশন কোঅপারেশন (APLAC/এপলাক) এবং ইন্টারন্যাশনাল ল্যাবরেটরি অ্যাক্রেডিটেশন কোঅপারেশন (ILAC/আইলাক) এর পূর্ণ সদস্য।

দেশে উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তির শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে। এসব কারখানায় বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান দখল করে নিয়েছে। পাদুকা শিল্প বিশ্বে অষ্টম স্থান অধিকার করেছে। এ দেশের ওষুধ ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের ১৫১টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশে নির্মিত জাহাজ এখন ডেনমার্ক, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস্, ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপের দেশগুলোতে বিক্রি হচ্ছে। বাইসাইকেল ইউরোপসহ বিশ্বের ৩০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। দেশে শিপ রিসাইক্লিং খাত দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে অগ্রগামী ৫টি দেশের মধ্যে একটি।

বৈশ্বিক শিল্প ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তির দাপট দৃশ্যমান। এটা বাংলাদেশের জন্য একইসাথে চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এ চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হতে এবং উদ্ভূত সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অ্যাক্রেডিটেশন হবে একটি কার্যকর হাতিয়ার। অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবরেটরি ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়িয়ে এ শিল্প বিপ্লবের সুফল ভোগের প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই। পিআইডি ফিচার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রধান সম্পাদক : তোফায়েল হোসেন তোফাসানি
বার্তা সম্পাদক : রোমানা রুমি, বি-১১৬/১ শিকদার টাওয়ার. বাসস্ট্যান্ড, সোবহানবাগ, সাভার, ঢাকা-১৩৪০
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত : ক্রাইম নিউজ ইন্টারন্যাশনাল ( প্রা: ) লি:,
ফোন ও ফ্যাক্স : ০২-৭৭৪১৯৭১, মোবাইল ফোন : ০১৮৫৬৪১৫০০০
ই-মেইল : cninewsdesk24@gmail.com, cninews10@gmail.com
কপিরাইট : সিএনআই নিউজ ( নিউজ এজেন্সী )
Design & Developed BY PopularITLimited